এয়ার এশিয়া ডিসাস্টারঃ কি হতে পারে অনুসন্ধানের সম্ভাব্য কারণগুলো(ভিডিও)
সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ, রবিবার, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৪


এয়ার এশিয়া ডিসাস্টারঃ কি হতে পারে অনুসন্ধানের সম্ভাব্য কারণগুলো(ভিডিও)

সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ- লন্ডন থেকে


এয়ার এশিয়া কিউজেড৮৫০১- যা বলা হয়েছেঃ

এয়ার এশিয়ার কিউজেড৮৫০১ ফ্লাইট ইন্দোনেশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সুরাবাইয়া থেকে সকাল ০৫.২০ মিনিটে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে, যাতে দুই ঘন্টা ১০ মিনিট উড্ডয়নে সিঙ্গাপুর পৌঁছানোর শিডিউল ছিলো। দক্ষিণ এশিয়ার এই প্রধান এয়ারলাইন্স হোব- এয়ার এশিয়ায় ঐ সময়ে ১৫৫ জন প্যাসেঞ্জার, দুই জন পাইলট, একজন ইঞ্জিনিয়ার, চারজন কেবিন ক্রু সহ সর্বমোট ১৬২ জন নিয়ে যাত্রা করেছিলো।। এদের মধ্যে তিন জন ইন্দোনেশিয়ার, তিন জন সাউথ কোরিয়ান সহ একজন করে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ফ্রান্সের যাত্রী ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিলো। একজন ব্রিটিশ নাগরিক থাকার কথা ব্রিটিশ মিডিয়া দাবী করছে। আর ইন্ডিপেন্ডেন্ট লিখেছে ব্রিটিশ ফরেন অফিসিয়াল বলছে তাদের একজন নাগরিক থাকার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

এয়ার এশিয়া নির্ধারিত শিডিউলের কয়েক মিনিট পর উড্ডয়ন করেছিলো এবং উড্ডয়নের ৪১ মিনিট পর এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল এর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে ইন্দোনেশিয়া প্রথম থেকেই বলে আসছে। তবে এয়ার লাইন্স দাবী করছে, খারাপ আবহাওয়ার কারণে ট্র্যাফিক কন্ট্রোল থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে এর গতিপথ পরিবর্তনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো। এবং এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল রেকর্ড মতে পাইলট ও ক্রু থান্ডার স্টর্ম থেকে বিমানটিকে রক্ষার জন্য রুট পরিবর্তনের রেকর্ড রয়েছে কন্ট্রোলরুমের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে আগে।

তদন্তের সম্ভাব্য যে সব কারণ বা দিক দেখা হতে পারেঃ

এই মুহুর্তে তদন্তে ফোকাস করা হচ্ছে বিমান দুর্ঘটনা, যেহেতু খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে বিমানটি পতিত হয়েছিলো বলে এই পর্যন্ত ট্র্যাফিক কন্ট্রোলরুমের রেকর্ড বিদ্যমান।



বিশ্বব্যাপী বিমান দুর্ঘটনা এবং ওয়েব ঘটনাবলীর রেসপেক্টেড কমেন্টেটর স্কট হ্যামিল্টন এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন, তদন্ত দল খারাপ আবহাওয়াকে তাদের সার্চ এবং তদন্তের প্রধান বিষয় বা অগ্রাধিকার দিয়ে এগুবেন। তাদের কাছে মনে হতে পারে অত্যধিক বিজলী চমকানো প্রচন্ড ঝড়ো ঘুর্ণি আবহাওয়ার কবলে পড়ে বিমানটি এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। হতে পারে সেজন্য বিমানটি ক্র্যাস হয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপিত হয়েছে অথবা তদন্তকারী দল বিমানটির দুর্ঘটনাকবলিত অবস্থায় রক্ষা পেতে সক্ষমতার ডিজাইনের উপর ভর করেও এগুতে পারেন।

এয়ার এশিয়ার পেছনের ইতিহাসঃ

এয়ারলাইন্সের ব্যবসার স্থল হলো মালয়েশিয়া এবং এর বিজনেস সাফল্য প্রশ্নাতীত। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই ভার্সনের আরো এক ইউরোপ ভার্সন যার নাম ইজি জেট- উভয়ই বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত দক্ষ, সফলতার সাথে হাই ফ্রিকোয়েন্সি এবং বিরামহীনভাবে সার্ভিস প্রদানের রেকর্ড রয়েছে। ২০০১ সালে ৯/১১ এর পর মালয়েশিয়ার বর্ণাঢ্য এক ব্যবসায়ী- যার নাম টনি ফারন্যান্ডেজ স্যার রিচার্ড ব্রানসনের উপদেশে অনুপ্রাণিত হয়ে মালয়েশিয়ায় এই এয়ার এশিয়া ক্রয় করে নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন।এই মালয়েশিয়ান ব্যবসায়ী টনির মেজরিটি শেয়ার হলো ব্রিটেনের কুইন্স পার্কের রেঞ্জার্স ফুটবল ক্লাবের। একই সাথে এই টনি হলেন ল-কষ্ট হোটেল ব্যবসা সহ ল-কষ্ট আন্তর্জাতিক মানের বিমান ব্যবসায়ের এখন অন্যতম এক পুরোধা। কিন্তু ব্রিটিশ কোম্পানীতে টনির ব্যাপারে বলা হয়েছে, যদিও তিনি বিমান ব্যবসায় অধিক পরিচিত বা অভিজ্ঞতা নেই তথাপি তিনি হলেন প্রায়ই বিমান ব্যবসায়ের কাছাকাছি মনাদের একজন, যার ব্যবসা মূলত বিমান ব্যবসা কেন্দ্রিক। এখন পর্যন্ত এই বিমান ব্যবসায়ী ও তার কোম্পানি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এশিয়া এয়ারলাইন্স সহ মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স, গারোদা ইন্দোনেশিয়ার বিমান ক্যারিয়ারের মালিক। এই এই এশিয়া এবং তার বিপরীতে প্রতিযোগী টাইগার এয়ারলাইন্স হলো ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সব চাইতে ল-কষ্ট এয়ার লাইন্স।অবশ্য লন্ডন কুয়ালালামপুর রুটে এরা এর আগে যাত্রী পরিবহন করতো কিন্তু লাভজনক না হওয়াতে তা পরিত্যক্ত হয়। এ বছর এয়ার এশিয়া ৫০ মিলিয়ন যাত্রী বহন করার রেকর্ডের অধিকারি।


এয়ার এশিয়ার হেড কোয়ার্টার হলো মালয়েশিয়ায় কুয়ালালামপুরে। গতকাল সুরাবিয়া যাওয়ার পথে টনি ফারন্যান্ডেজ টুইট বার্তায় লিখেছেন, আমরা সার(সার্চ এন্ড রেসকিউ) এর উপর ভরসা করছি। সেজন্যে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়ার সরকারকে সহায়তা প্রদানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

এয়ার এশিয়া এয়ার ক্রাফট কেমনঃ

ছয় বছরের পুরনো এ৩২০ এয়ার বাস ২০০৮ সালে ডেলিভার্ড করা হয় ইন্দোনেশিয়ার কাছে। এই এ৩২০ প্রথম আকাশে উড়ে ১৯৮৭ সালে এবং এর পর বিশ্বব্যাপী এর বিক্রি ও পরিবহন খুবই ট্র্যাক রেকর্ডের অধিকারি। এই এয়ারবাস ইজিজেট সহ ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ এবং বিশ্বব্যাপী অন্যান্য এয়ারলাইন্স ব্যবহার করে থাকে। এ৩১৮, এ৩১৯, এ৩২০ মোটামুটি একই ধরনের সাফল্য রয়েছে। এয়ার ক্রাফটের সেফটি রেকর্ডও খুবই ভালো। এর ইতিহাসে শুধু মাত্র ৭ জন প্যাসেঞ্জার লস্টের রেকর্ড ছাড়াও মাত্র ছয় বছর আগে হন্ডোরাসে এয়ার ক্র্যাশের একটি মাত্র রেকর্ড রয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ান এয়ারলাইন্স ইউরোপে নিষিদ্ধঃ

যাত্রী পরিবহন নিরাপত্তা ইস্যুতে ইউরোপের সব দেশেই বলতে গেলে ইন্দোনেশিয়ার প্রায় সব কটা এয়ারলাইন্স নিষিদ্ধ। কেননা ইন্দোনেশিয়ার এয়ারলাইন্সের সেফটি রেকর্ড অত্যন্ত নিম্নমানের। কিন্তু এয়ার এশিয়া ইউরোপে নিষিদ্ধ নয়- তার উঁচু মানের সেফটি রেগুলেটরি মেইন্টেইনের কারণে।

বাজেট এয়ারলাইন্স এবং সেফটি কনসার্ণঃ

এয়ার এশিয়া যেহেতু বাজেট এয়ারলাইন্স সেহেতু এভিয়েশন এক্সপার্টদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আন্তর্জাতিক রুটে ছোট এয়ারলাইন্স যাত্রী নিরাপত্তা রেগুলেটরি চেক অনুযায়ী মেইন্টেইন করেছে কিনা যেহেতু ইন্দোনেশিয়ার নিরাপত্তা ইস্যু অত্যন্ত নিম্নমানের বলে প্রতীয়মান হয়েছে ইতিমধ্যে। তবে এভিয়েশন এক্সপার্টরা এখনি এয়ার এশিয়ার ক্ষেত্রে সেসব চিহ্নিত করতে নারাজ। এখন পর্যন্ত সমস্ত রেকর্ড বলছে এর নিরাপত্তা মেইন্টেইন মান অত্যন্ত উঁচুমানের।

এমএইচ৩৭০ এবং কিউজেড ৮৫০১!

মালয়েশিয়ার বিমান ফ্লাইট এমএইচ ৩৭০ যাত্রী সহ হারিয়ে যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত এর কোন সঠিক ব্যাখ্যা দাড় করানো সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ফ্রান্সের সাবেক এয়ারলাইন্স বিশেষজ্ঞ ও ক্যাপ্টেন বলছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়ান ফ্লাইট এমএইচ৩৭০ গুলি করে ধ্বংস করেছে, যেহেতু দিয়েগো গার্সিয়াতে মার্কিনীদের বড় বিমান ও নৌঘাটি রয়েছে এবং ফ্লাইট এমএইচ৩৭০ দিয়েগো গার্সিয়ার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলো। এর পর গত জুলাইতে ইউক্রেনে ফ্লাইট এমএইচ৭১ গুলিকরে ভূপাতিত করার সংবাদ বিশ্বব্যাপী আরো একবার শিরোনাম হয়েছিলো। ফ্লাইট কিউজেড ৮৫০১ এয়ার এশিয়াও মালয়েশিয়া বেইসড বিজনেস বাজেট এয়ারলাইন্স। অনেকেই এখানে কাকতালীয় এক সম্পর্ক- যাত্রী নিয়ে রাডার থেকে হারিয়ে বা নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার যোগসূত্র হিসেবে দেখছেন। যদিও বিমান তিনটি একই দেশের হলেও তিনটি দুর্ঘটনার বা নিখোঁজ হওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে তিনটি স্পষ্ট অবস্থান।

বিরামহীন সার্চঃ

নিখোঁজ হতভাগ্য বিমানটিকে খোজার জন্য তিন দেশের বিরামহীন সার্চ চলছে ( রাতের বেলা বাদে)। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীও ইতিমধ্যে সার্চে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে যাত্রীদের স্বজনদের আহাজারি শুধু ভারি হচ্ছে। প্রিয়জনের সংবাদ জানার অধীর আগ্রহে তারা অপেক্ষা করছেন। এয়ার এশিয়া কিংবা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর এখনো কোন আশার আলো জানাতে পারেনি। সারারাত দিনের স্বজনদের কান্না এখন একটাই- লাশও কী শেষ পর্যন্ত মিলবে ? নাকি হতভাগ্য এয়ার এশিয়া এমএইচ৩৭০ এর ভাগ্য বরণ করতে চলেছে ?



Salim932@googlemail.com
28 Dec 204, London