কারি ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে আপনারা ব্রিটিশ সোসাইটির অংশ হয়ে আছেন- হোম সেক্রেটারি থেরেসা মে
সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ, মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ০২, ২০১৪


কারি ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে আপনারা ব্রিটিশ সোসাইটির অংশ হয়ে আছেন- হোম সেক্রেটারি থেরেসা মে

সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ-লন্ডন থেকে


ব্রিটেনের প্রায় ৮০ ভাগ বাংলাদেশী, ভারতীয়, পাকিস্তানী রেস্টুরেন্ট সেক্টরে কাজ করেন। ব্রিটিশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে এই সেক্টরে প্রায় ৮০ হাজারের মতো বাংলাদেশী কর্মরত।আর ভিএটি ও অন্যান্য সূত্রে জানা গেলো প্রায় ১ লক্ষ ২৬ হাজারের মতো বাংলাদেশী-ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট রয়েছে।কিন্তু উইকিপিডিয়া এবং ব্রিটিশ কারি এওয়ার্ডস বলছেন, এই সেক্টর থেকে প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন পাউন্ড আয় যোগ হয়ে থাকে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে। এমন কথাই দ্ব্যার্থহীনভাবে কারী এওয়ার্ডসের অনুষ্ঠানে দাবী করা হয়েছে। ব্রিটেনের এই সেক্টরে যে কটা পুরষ্কার বা স্বীকৃতি রয়েছে, কারী এওয়ার্ডস নিঃসন্দেহে প্রথম সারিতে অবস্থান এবং ব্রিটেনের মূলধারার মিডিয়া ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের স্বীকৃতির প্রায় কাছাকাছি এক অবস্থানে রয়েছে। এ সেক্টরকে একটি নির্দিষ্ট শিল্পের স্থানে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম এক কৃতিত্বের দাবী যিনি করতে পারেন, তিনি হলেন এনাম আলী এমবিই।

ব্রিটেনের যে কয়টা সেক্টর রয়েছে, তার মধ্যে বলা যায় সব চাইতে নির্বিঘ্ন এবং নিরাপদ এক সফল ব্যবসায়ের সেক্টর এই ক্যাটারিং ইন্ডাস্ট্রি। এখাত থেকে বছরে লক্ষ লক্ষ ভিএটি সরকার পেয়ে থাকে। বিগত লেবার সরকারের সময় থেকে বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দার দখলের সময় প্রায় সকল ক্ষেত্র নানা আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়লেও ক্যাটারিং সেক্টর ( তাও শুধু বাংলাদেশী-ইন্ডিয়ান ) মন্দার কবল থেকে নিজেদেরকে দূরত্বে রাখতে সক্ষম হয়। যেখানে সরকারি ও বেসরকারি সেক্টরের সকল ক্ষেত্রেই চাকুরী কাট-ছাট ও বাজেট সংকোচন করে চলতে হয়েছে, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি ও ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরের অনেক নামকরা প্রতিষ্ঠানকে প্রায়ই বিগত কয়েক বছরে বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করে এডমিনিস্ট্রেশনে চলে যাওয়া যেখানে নিত্য-নৈমিত্তিক খবর ছিলো, যার রেশ এখনো ব্রিটিশ অর্থনীতিতে রয়ে গেছে, সেখানে বাংলাদেশী ক্যাটারিং ইন্ডাস্ট্রি বেশ নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে কোন প্রকারের দেউলিয়া ও দেনার দায় ছাড়া সামান্য কাট-ছাট করে সফলতার সাথে এগিয়ে চলছে। বাংলাদেশের ক্যাটারিং সেক্টরের সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা খোদ ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে হোম সেক্রেটারি থেরেসা মে, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ড সহ সকলেই সমানভাবে পঞ্চমুখ। আর বাংলাদেশী শেফ ও ওয়েটারদের সেবার মান ও দক্ষতার কথাতো হর হামেশা ব্রিটিশ মিডিয়ায় ফলাও করে প্রকাশ করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টের সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ নানা তারকা সম্বলিত খেতাবের কথাতো লেগেই আছে।

রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে ঈর্ষনীয় সাফল্য করে খ্যাতি অর্জন করে ব্রিটিশ মেইন ষ্ট্রীম মিডিয়া ও মেইন ষ্ট্রীম রাজনীতিতে ঝড় তুলেছেন আমাদের রেড ফোর্টের আমিন আলী, লি-রাজের এনাম আলী এমবিই, ব্রিটানিয়া স্পাইসের সাবেক কন্সাল জেনারেল ওয়ালী তছর উদ্দিন এমবিই, শাহগীর বখত ফারুক, বজলুর রশীদ, পাশা খন্দকার, ভোজনের মাহতাব মিয়া, বিসিসির মুকিম চৌধুরী সহ হালের তরুণ ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের সাফল্য এক্ষেত্রে আরো অগ্রগামী। তরুণদের ক্যাটারিং সেক্টরের নানা ও নিত্য নতুন ফিউশন এক্ষেত্রে অগ্রজদের ছাড়িয়ে গিয়েছে, যেমন ম্যাঙ্গো, তামারিন,ক্যাফে স্পাইস,মোম্বাই এক্সলেম্পরারী ইত্যাদি।

সেই কবে কখন ব্রিটেনে প্রথম কারী সাম্রাজ্য গড়ে উঠার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিলো, তা রীতিমতো গবেষণার দাবী রাখে। হালের ব্রিটেনের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় (যেমন লন্ডন ও নিউক্যাসল)এ নিয়ে গবেষণা শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে। যদি তাই হয় আমাদের ক্যাটারিং সেক্টরের আধুনিকায়ন ও নিত্য-নতুন ফিউশন ক্রিয়েট করার ক্ষেত্রে অবদান রাখবে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

গতকাল সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি বাটারসি এভ্যুলিশন ছিলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কারী ইন্ডাস্ট্রির এক স্বর্ণ-দুয়ারের সূচনা থেকে পরিপূর্ণতায় প্রাপ্ত এক ঝাঁক উজ্জ্বল তারকার আর সেলেব্রিটির সাথে কারী ইন্ডাস্ট্রির বিখ্যাত শেফদের পদচারণায় মুখরিত ও সঙ্গীতের অপূর্ব সমারোহের রিনি ঝিনি আর কাপ পেয়ালা ডিশের টুং টাং শব্দের মাতাল হাওয়ায় শিহরিত,পুষ্প-পল্লবিত, সুশোভিত এক মনোরম রাত। যে রাতের ভূয়সী প্রশংসা করতে গিয়ে লন্ডনের ডেইলি মেইল লিখেছে- While Kate Moss and Victoria Beckham hobnobbed with Anna Wintour and Sir Philip Green at the London Coliseum last night, in Battersea, a very different awards ceremony was taking place. আর হসপিটালিটি নিউজ লেটার শিরোনাম করেছে David Cameron Applauds Uk Curry Industry for Bringing Country Together


গত রাতের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে হোম সেক্রেটারি থেরেসা মে এই সেক্টরের ভূয়সী প্রশংসা করার সাথে সাথে বললেন, এই সেক্টরের মাধ্যমে আপনারা ব্রিটেনের জীবন ধারার অংশ হয়ে গেছেন। তিনি বলেন এই ব্যবসা ব্রিটেনের জীবন যাপনের অংশ পাব ব্যবসায়ের সাথে অত্যন্ত তুলনীয় এবং একই মাত্রার, যা আমাদের অর্থনীতিতে বিরাট এক ভুমিকা রেখে চলেছে।


ব্রিটেন হলো বহু বর্ণ, বহু ধর্ম, আর কল্যাণ মূলক এক রাষ্ট্র। এখানে সকল মত পথ সমানভাবেই এক মোহনায় মিলিত হয়ে উদারভাবে সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা কয়রে থাকেন। ব্রিটিশ কারি এওয়ার্ড এই ঝমকালো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন ব্রিটেনের মন্ত্রী, এমপি, সাংবাদিক, অভিনেতা-অভিনেত্রী সহ ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরের শ্বেতাঙ্গ, অ-শ্বেতাঙ্গ, ভারতীয়, বাংলাদেশী সহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশা ও বর্ণের প্রায় দু‘হাজার অতিথি। ইভেন্ট হোষ্ট ব্রডকাস্টার কেট সিলভার্টন ও কমেডিয়ান ব্রডকাস্টার হারডিপ কোহলির সাথে ব্রিটিশ টিভি তারকাদের সুন্দর ও সাবলীল উপস্থাপনায় এই বর্নাট্য এওয়ার্ড বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন বিজনেস ম্যাগনেট ড. ভিজে মালায় চেয়ারম্যান ইউবি গ্রুপ, লর্ড চ্যান্সেলর এন্ড সেক্রেটারি অব ষ্ট্যাট ফর জাস্টিস ক্রিস গ্রিফিন, সেক্রেটারি অব ষ্ট্যাট ফর এডুকেশন এন্ড মিনিস্টার ফর ওমেন এন্ড ইক্যুয়ালিটিস নিকি মর্গান, সাবেক মিনিস্টার কিথ ভাজ, ফুটবলার ডেভিড স্যামূয়েল এমবিই, প্যারা-অলিম্পিয়ান ডেভিড ওয়ের সিবিই, চ্যানেল ফোর নিউজ ব্রডকাস্টার কৃষ্ণ-গুরু মুর্তি, আইটিভি নিউজ রিপোর্টার র্যা গ ওমর, অভিনেতা আদিল রায়, সাবু কাপুর, শবনা গুলেটি, সার্জেন্ট জনসন বেহারী, টিভি প্রেজেন্টার লিজা ক্যান্ডি, প্যাট শরাফ, ন্যান্সি ডি ওলিও,, নেইল হ্যামিল্টন সহ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বেশ কয়েকজন এমপি ও হাউজ অব লর্ড এর ডজন খানেক সদস্য সহ ব্রিটেনে অবস্থিত বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।


ব্রিটিশ কারি এওয়ার্ডের ফাউন্ডার ব্রিটিশ বাংলাদেশী এনাম আলী এমবিই তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন যদিও ভারতীয়দের মাধ্যমে ব্রিটেনে কারি ব্যবসা শুরু হয়, ব্রিটেন সহ বিশ্বব্যাপী এর প্রসার ঘটেছে বাঙালিদের দ্বারা । আমি এই শিল্পকে ব্রিটিশ কারি হিসেবে পরিচিত করতে কাজ করছি, এখন এটি শুধু ইন্ডিয়ান কারী নয়, ব্রিটিশ কারি হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। এই ব্যবসায় এখন সকল কমিউনিটিই এগিয়ে আসছে সমান ভাবে, কারি ইন্ডাস্ট্রি ব্রিটিশ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তিনি আরো বলেন আমি কারি এওয়ার্ডকে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে যেতে চাই যা কেউ কোন দিন কল্পনাও করেনি।


থেরেসা মের উপস্থিতিতে এনাম আলী এমবিই বলেন, ব্রিটিশ দূতাবাস ভিসা প্রসেসিং বাংলাদেশ সরিয়ে নেয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে অবিলম্বে বাংলাদেশে প্রসেসিং সেন্টার ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানালে থেরেসা মে বলেন, আগের তুলনায় প্রসেসিং সময়ে এখন আরো তাড়াতাড়ি এবং অল্প সময়ের মধ্যে, ১৫ কার্য দিবসের মধ্যে ভিসার সিদ্ধান্ত আবেদনকারীকে জানানো হচ্ছে।

এনাম আলী এই শিল্পে দক্ষ শেফ ও নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে সংকট সমাধানের জবাবে থেরেসা মে বলেন পূর্ণ সহযোগিতা ও সরকারের তরফ থেকে সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করা হবে।

এবারের ২০১৪ যারা পুরষ্কার পেয়েছেন তাদের নাম হলো-
Best in London Central and City- দ্য সিনামন ক্লাব
The Cinnamon Club
Best in London Suburbs- শাম্পান-থ্রি ওয়েলিং
Shampan 3 Welling
Best in South East- মালিকস
Maliks
Best in South West- মাইরিস্টিকা
Myristica
Best in North East- আগ্রা মিডপয়েন্ট
Aagrah Midpoint
Best in North West- ব্লু টিফিন
Blue Tiffin
Best in Midlands- মেম সাব-নটিংহাম
Mem Saab, Nottingham
Best in Wales- রাসই ইন্ডিয়ান কিচেন
Rasoi Indian Kitchen
Best in Scotland- লাইট অব বেঙ্গল
Light of Bengal
Best Casual Dining- ডিশুম কভেন্ট গার্ডেন
Dishoom Covent Garden
Newcomer of the Year- ফাইভ রিভার্স আ-লা-কার্টে
Five Rivers A La Carte
Best Delivery- দ্য চিলি পিকল
The Chilli Pickle
Lifetime Achievement- শামস উদ্দিন
Shams Uddin Khan


উল্লেখ্য ব্রিটিশ কারি এওয়ার্ডস ২০১৪ দশ বছরে পদার্পণ করলো। এইদেশ সহ ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড, কারি ইন্ডাস্ট্রি ডট কো ডট কম সহ আমাদের একরাশ শুভেচ্ছা ও বিজেতাদের অভিনন্দন।
(তথ্য চিত্র, ভিডিও- কারি এওয়ার্ডস ২০১৪ রিকগনাইজড পিআর মি. টনি গিলের সৌজন্যে প্রাপ্ত) ।
ভিডিও এমবডেড

ভিডিও লিংক
http://youtu.be/R4t2V0QDoDY
ফ্ল্যাশ ব্যাক ২০১৩- প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন কারি এওয়ার্ডসের লিঙ্ক -
http://youtu.be/HbYNjISJY6Y

(লেখকঃ নিউজ এডিটর- বেতার বাংলা ১৫০৩ লন্ডন)
Salim932@googlemail.com
02nd December 2014,London