ব্রিটিশ বিনিয়োগ ভিসা অকসনে যাচ্ছে আইনজীবীদের কড়া সমালোচনা
সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ, শনিবার, মার্চ ০১, ২০১৪


ব্রিটিশ বিনিয়োগ ভিসা অকসনে যাচ্ছে আইনজীবীদের কড়া সমালোচনা

সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ-লন্ডন থেকে

গত সপ্তাহে ব্রিটেনের হোম অফিস এডভাইজরি কমিটি ব্রিটিশ ইনভেষ্টম্যান্ট ভিসার ক্ষেত্রে অভিনব এক প্রস্তাবনা পেশ করে, যা রীতিমতো ইমিগ্র্যাশন আইনের বিশেষজ্ঞ সহ ব্রিটেনের মূলধারার মিডিয়া যেমন গার্ডিয়ান, ইন্ডিপেন্ডেন্ট, বিবিসি, স্কাই, চ্যানেল ফোর ব্যাপক আলোড়ন তুলে। অনলাইনে অনেক ব্রিটেনবাসী ব্যাপক মিশ্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন। ফেসবুক বিশেষকরে টুইটারে রীতিমতো ঝড় বয়ে যায়।

ইমিগ্র্যাশন এডভাইজরি কমিটি:

এই কমিটি সাজেস্ট করেছে, এখন থেকে ব্রিটেনের ইনভেষ্টম্যান্ট ক্যাটাগরির এই ভিসা অকসনে বা নিলামে উঠানোর জন্য, যাতে অধিক দামে ইনভেষ্টম্যান্ট ভিসা নিলাম করা যায়।এক্ষেত্রে তারা ব্রিটেনের বহুল প্রচারিত ও জনপ্রিয় ক্যামলেটের লটারির ন্যায় বাছাইয়েরও সুপারিশ রেখেছেন।কমিটি চাচ্ছে অন্তত: একশো ভিসা নিলামে বিক্রি করে সরকারের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে।

ইনভেষ্টম্যান্ট ভিসার মূল্যমান বৃদ্ধির প্রস্তাব:

এডভাইজরি কমিটি এই ক্যাটাগরির ভিসার দামের পরিমাণ বৃদ্ধিরও সুপারিশ করেছে।বর্তমানে একজন ব্যবসায়ী ১ মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করে ব্রিটেনে বসবাস ও স্থায়ী হওয়ার সুযোগ লাভ কয়রে থাকেন। কমিটি বলছে, এই পরিমাণ বৃদ্ধি কয়রে ২ মিলিয়ন পাউন্ড করা উচিৎ । তারা বলছে, ২ মিলিয়ন পাউন্ড এর বিনিয়োগ ভিসা নিলামে নিলে এটা বাড়িয়ে ২.৫ মিলিয়ন অনায়াসেই করা সম্ভব।

বর্তমান বিনিয়োগ স্কিমে যা বলা আছে:

ব্রিটেনের চলমান বিনিয়োগ ক্যাটাগরির ভিসা স্কিম চালু রয়েছে। হোম অফিস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে যে কেউ ১ মিলিয়ন, ৫ মিলিয়ন, ১০ মিলিয়ন পাউন্ড ব্রিটেনে বিনিয়োগ করে যথাক্রমে ৫ বছর, ৩ বছর, ২ বছরের জন্য ব্রিটেনে থাকার অনুমতি লাভ করে থাকেন।এবং অবশ্যই তারা স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ লাভ করে থাকেন।

প্রফেসর স্যার ম্যাটকাফের বক্তব্য:

ইমিগ্র্যাশন এডভাইজরি কমিটির চেয়ার প্রফেসর স্যার ডেভিড ম্যাটক্যাফ বলেছেন, বর্তমানে বিনিয়োগের আওতায় বিদেশিরা যেভাবে বিনিয়োগ করে ব্রিটেনে থাকার সুযোগ লাভ করে থাকেন, তাতে ব্রিটেন আর্থিকভাবে খুব একটা লাভবান হচ্ছেনা।সেজন্যে তিনি এবং তার কমিটি প্রস্তাবিত এই ভিসা স্কিম নিলামে নিয়ে বৃদ্ধি করার মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের আর্থিকভাবে উপকৃত হওয়ার জন্য সুপারিশ করেছেন বলে জানিয়েছেন। অবশ্য তিনি কমন্স সিলেক্ট কমিটিকে জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে প্রোপার ডিসকাশন ক্যামব্রিজ কলেজ কিংবা লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিকস এর মাধ্যমে একটি প্যাকেজ ডিলের আওতায় ( যা ১০ মিলিয়নের মতো)আলাপ-আলোচনা, কনসাল্টেশন করা যেতে পারে।

হোম অফিসের অবস্থান:

হোম অফিসের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইমিগ্র্যাশন এডভাইজরি কমিটির প্রস্তাবিত এই সুপারিশ তারা গ্রহণ করার চিন্তা ভাবনা করছেন।যদিও বিরোধী লেবার সূত্রে জানা গেছে, এর আগে একই প্রস্তাব হোম অফিসে উত্থাপিত হলে হোম অফিস রিজেক্ট কয়রে দেয়, তখন পয়েন্ট বেইজড সিস্টেম ভিসা পদ্ধতি চালু করা হয়।

ইমিগ্র্যাশন আইনজীবীদের বিরোধিতা:

এডভাইজরি কমিটির এই প্রস্তাব নিয়ে ইমিগ্র্যাশন আইনজীবীরা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কিংসলি ন্যাপলী ফার্মের হেড অব বিজনেস ইমিগ্র্যাশন মিঃ নিক রলাসন বলেছে, প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থা চালু হলে ইবে কালচার চালু হয়ে যাবে এবং তা হবে জনগণের মুখে মুখে ব্রিটিশ ভিসার খারাপ এক টেস্ট হিসেবে প্রতিফলিত হবে।

এক্ষেত্রে সোফি ব্যারেট ব্রাউন অব লাউরা ডিভাইন সলিসিটর্স এর বিরোধিতা করে বরং প্রফেসর ম্যাক এর এ সংক্রান্ত বিকল্প কনটেকষ্ট যা তিনি এনালাইসিস সহ টায়ার-ভিসার ব্যাপারে অর্থনৈতিক ইমপ্যাক্ট খতিয়ে দেখার রিকমেন্ডেশন করেছেন, সেদিকটা ভালো করে যাচাই বাছাই করার কথা বলেছেন।

উল্লেখ্য গত বিশ বছর ধরে ব্রিটেন তথাকথিত ধনীদের জন্য এই বিনিয়োগ ভিসা স্কিম চালু রেখেছে। যাতে দেখা গেছে মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, চীন থেকে অধিক সংখ্যক ধনী ব্যবসায়ী ও ধনকুবেরা নিজেদের দেশের অস্থির অবস্থার কথা বিবেচনা করে অধিক নিরাপত্তা ও শান্তির হ্যাভেন ব্রিটেনে এই স্কিমের অধীনে এসে সেটেল্ড হওয়ার নজির রয়েছে।ইদানীং কালের ভারত, বাংলাদেশ, ব্যাংককের ধনকুবেরা নিজ দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার দুর্বিপাকে পড়ে এই স্কিমের সুযোগে ব্রিটেনে বিনিয়োগ কয়রে স্থায়ী হচ্ছেন।

এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০০৮ সালে ১,৬৪৭ জনের মধ্যে রাশিয়া ৪৩৩, চায়না ৪১৯, আমেরিকা ৯৩, ইজিপ্ট ৪৩, ইন্ডিয়া ৪৪, কাজাখিস্তান ৪১, ইরান ৩৮, পাকিস্তান ৩৮, অস্ট্রেলিয়া ৩৬, কানাডা ৩৬ জন নাগরিক ব্রিটেনে স্থায়ী হয়েছেন এই বিনিয়োগ ভিসা স্কিমে। বর্তমানে এই স্কিমের সুযোগে হোম অফিস বলছে ডাবল এবং মাত্রাতিরিক্ত হারে অনেকে স্থায়ী হয়েছেন, সাথে তাদের পোষ্য ও সন্তান-সন্ততি রয়েছেন। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া আনুপাতিকহারের ফিগার অধিক বলে জানা গেছে।

নেট মাইগ্র্যাশন হার বৃদ্ধি:

অপর এক রিপোর্টে প্রকাশ যে বর্তমান কোয়ালিশন সরকার ব্রিটেনের মাইগ্র্যাশন টার্গেট রুখতে হিমশিম খাচ্ছে। রিপোর্টে বলছে, এ বছর ৫৩২,০০০ ইমিগ্র্যান্ট বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একই সময়ে গত বছর ছিলো ৩২০,০০০। অর্থাৎ একই কোয়ার্টারে দেখা যাচ্ছে প্রায় ৩৫,০০০ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ন্যাশনাল পরিসংখ্যান দাবি করছে। অথচ গত বছর ২০১০ সালে ২৫২,০০০ আর ২০১২ সালে ছিলো ১৭৭,০০০ মাইগ্র্যাশন- যা ঐ সময়ে কোয়ালিশন সরকার টার্গেট কমিয়ে আনতে সক্ষম হলেও বর্তমানে রোমানিয়া, পর্তুগাল, বুলগেরিয়া থেকে মানব স্রোত ব্রিটেনে বেটার জব মার্কেট এবং বেনিফিট সিস্টেমের কারণে মাইগ্র্যাশন করছে বলে তারা দাবি করছে।কোয়ালিশন সরকারের এই নেট টার্গেট নীতিকে এখন অনেকের কাছে ব্যাপক সমালোচিত হচ্ছে।ধারনা করা হচ্ছে এর নেতিবাচক প্রভাব আগামী নির্বাচনে পড়বে।

Salim932@googlemail.com
28th February 2014, London.