বিলাতের কবিতাঃ চার রাজপুত্র ও এক রাজকন্যার গল্প
ফরীদ আহমদ রেজা, রবিবার, জানুয়ারি ২০, ২০১৩


বিলাতের কবিতাঃ চার রাজপুত্র ও এক রাজকন্যার গল্প
ফরীদ আহমদ রেজা
বিলাতের তরুণ কবিদের আমি উৎসাহী পাঠক। তাদের কারো কারো লেখায় কবিতাকে বহুদূর এগিয়ে নেয়ার অঙ্গীকার প্রত্যক্ষ করে আমি মাঝে মাঝে অভিভূত হয়ে পড়ি। প্রবীণ লেখকরা চাইলে ইতিবাচক আলোচনার মাধ্যমে তরুণদের আরো সামনে নিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু মনে হচ্ছে আমাদের প্রবীণ লেখকরা শুধু নিজেরা প্রশংসা পেতে চান, অন্যের প্রশংসা করতে পারেন না বা চান না। আমি জানি না এর কারণ কি? এটা কি নবীনদের ব্যাপারে প্রবীণদের হিংসা, না কি প্রবীণদের অপারগতা?
শব্দপাঠ প্রকাশিত কাব্য-সংকলন ‘তৃতীয় বাংলার কবিতা’ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমি বিলাতের কবিদের কাব্যভাবনা সম্পর্কে সামান্য কিছু ইঙ্গিত দিয়েছি। তরুণদের ব্যাপারে সেখানে আমি বলেছি, ‘এরা সবাই বয়সে তরুণ এবং লেখালেখির ব্যাপারে সিরিয়াস। তাদের মধ্যে বাংলা কবিতাকে বহুদূর নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা লুক্কায়িত রয়েছে। গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে তাদের উৎসাহ প্রদানে প্রবীনদের এগিয়ে আসা দরকার। ইতোপূর্বে আমি এই একঝাঁক তরুণ কবি-কর্মীর মধ্যে মুজিব ইরম, ফারুক আহমদ রনি, দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু, শাহ্‌ সোহেল এবং সুমন সুপান্থকে বিলাতে বাংলা কবিতার পাঁচ রাজকুমার অভিধায় অভিহিত করে তাদের লেখার ব্যাপারে আমার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছি। অন্যদের নিয়ে লেখার প্রয়োজনীয়তাও এখন তীব্রতর হচ্ছে। আমার আশা ছিল প্রবীনরা এ বিষয়ে এগিয়ে আসবেন। দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া তরুণদের উৎসাহ দেয়ার ব্যাপারে আমাদের অগ্রজরা কেন যে মুখে কুলুপ দিয়ে বসে আছেন তা আমার বোধগম্য নয়।’ এ পাঁচজনের বাইরে তরুণ কবি ওয়ালি মাহমুদের কবিতা নিয়ে আমি স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা করেছি। আনন্দের বিষয় যে আমার সে আলোচনার পর কেউ কেউ নিরবতা ভেঙেছেন। অমরনাথ চক্রবর্তী লিখেছেন আহমদ ময়েজের কবিতা নিয়ে, সালেহা চৌধুরী আলোচনা করেছেন মাজেদ বিশ্বাসের কাব্যভূবন নিয়ে এবং এবং আহমদ ময়েজ অলোচনা করেছেন সৈয়দ মুহাম্মদ আলী রুম্মানকে নিয়ে।
তৃতীয় বাংলার কবিতা নিয়ে আমার উপরোক্ত আলোচনা সাপ্তাহিক সুরমায় প্রকাশিত হয়। সে লেখা পাঠ করে অগ্রজ কবি ও কথাশিল্পী সালেহা চৌধুরী আমাকে একটি মজার প্রশ্ন করেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘যারা আপনার সম্পর্কে বাজে কথা বলে তাদেরও প্রশংসা করেন। এটা আপনি কি ভাবে পারেন? আপনার কি কারো বিরুদ্ধে কোন ‘মেলিস’ নেই?’ জবাবে তাকে বলি, আমি আমার প্রভূর কাছে সব সময় প্রার্থণা করি, আমার মনে যেন কারো ব্যাপারে হিংসা-বিদ্বেষ না থাকে। তা ছাড়া যার কাছে যে সম্পদ আছে তা-ই সে অপরকে দান করতে পারে। যার কাছে হিংসা আছে সে হিংসা-ই দান করবে। আমার কাছে শুভকামনা আছে, তাই আমি শুভকামনা প্রদান করছি। জসিম উদদীনের ভাষায় ‘কাঁটা পেয়ে আমি ফুল করি দান সারাটি জনম ভর।’

ইতোপূর্বে প্রকাশিত আলাচনার ধারাবহিকতায় আজ আমি বিলাতের আরো পাঁচজন কবিকে উপস্থাপন করছি। তাদের চারজন রাজকুমার এবং একজন রাজকন্যা। তবে এটা কোন পূর্ণাংগ আলোচনা নয়, এখানে আমি এ পাঁচজন কবির কাব্যভূবন সম্পর্কে পাঠকদের সমান্য কিছু ধারণা দেয়ার চেষ্টা করবো মাত্র। আমার আশা এবং বিশ্বাস আগামী দিনের সমালোচকরা তাদের পূর্ণাংগভাবে মূল্যায়ন করতে একদিন এগিয়ে আসবেন ।

আতাউর রহমান মিলাদঃ স্বাপ্নিক বিপ্লবী
আতাউর রহমান মিলাদ কবি অভিধা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিলাতে এসেছেন, সাথে নিয়ে এসেছেন জন্মভূমির জন্যে আবেগ আশ্রিত ভালোবাসা, অভিমান এবং অঙ্গীকার। এ পর্যন্তô তার দুঃসময়ের চিৎকার, হৃদয়ের জানালা খুলে, আর যদি একটা গুলি চলে, কবিতার চেক বই, স্মৃতিহীন অচিন আঁধার - এ পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। স্মৃতিকাতর বা নস্টালজিয়ায় আক্রান্তô মিলাদ কবিতার মাধ্যমে স্বদেশের মধুময় স্মৃতির প্রতি তার ভালবাসার অর্ঘø নিবেদন করেছেন। ‘স্মৃতির পাখিরা উড়ে যায় দূরে। মুছে যায় পালকের শেষ চিহ্ন। •• •• •• স্মৃতি কর্তিত হয় ভরহীনতায়। দু’হাতে সাঁতার কাটে অচিন আঁধার। যুবক, অভিমানে ভুলে যায় চেনা আল, ধূলোভরা সমূহ পথ। মনুর জলে জমা কৈশোরের স্রোত, বালিকার বুকে আঁকা শপথ।’ (শিরোনাম কবিতাঃ স্মৃতিহীন অচিন আঁধার)
মিলাদ ফেরারী আকাশে জীবনের ঘুড়ি উড়ানো ইতি করে ঘরে ফিরে যেতে চান। মেঘের পিচ্ছিল সিঁড়ি বেয়ে চাঁদের মন্দিরে পৌঁছে যাবার অসম্ভব স্বপ্নকে পেছনে ফেলে স্বদেশের আঙিনায় বসতি স্থাপনের আকাঙ্খায় তিনি উদগ্রীব। তার উচ্চারণ, তৃষ্ণার্ত পাখি কি ডানা মেলে উড়বেই মেঘলা আকাশে/ বিশ্বাসের দরোজায় কি ঝুলিয়ে দেবেনা আশ্বাসের চাবি? ঝড়ের আঘাতে শুধু উড়লোই সুখের ধূলোবালি যত্রতত্র/ রাখলিনা তারে তুই ভালোবেসে আপনার নন্দিত আঙিনায়/ বারবার বলি মিলাদ - তুই ফিরে যা সবুজের নরম গালিচায়/ ফিরে যা তুই আদিতম অক্ষরে, বীর্যবান শব্দের চিহ্নিত সীমানায়। (মিলাদের মুখোমুখিঃ আর যদি একটা গুলি চলে)
প্রবাস জীবনের অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ভরদুপুরে একা একা কান্দে খোলা মন। এই প্রবাসে দেশের লাগি কান্দে সকল জন। কার বুকে যে কিসের ব্যথা যায়না চোখে দেখা। দুঃখটা যে চিরকালই গোপন ফ্রিজে রাখা। টাকাকড়ি হাতের ময়লা বলা যতো সোজা, সারা জনম তারেই শুধু কারখানাতে খোঁজা।’ (পরবাসঃ স্মৃতিহীন অচিন আঁধার)
অন্যত্র তার উচ্চারণ, ‘মেঘের আস্তôরে ঢাকা সূর্যের সাহস। মেঘবন্দি বালিকারা বলাকা সহচরী। বৃষ্টি নৃত্য যায় বর্ষার জলে। আসে বর্ষা। আসে শ্রাবণের ঘনকালো চুল। কচুর আঁচলে জমে স্পর্শের লাজুক জল। জলের আয়নায় ভাসে বাংলার মুখ। মালতীর জলভরা চোখ। হৃদয় ঘর করে আবেগী ভাষায়। ভালোবেসে কথা কয় বিরহী প্রেম। মনুতে জোয়ার আসে, সখা থাকে পরানের গহীন।’ (শ্রাবণের মেঘ অন্তôহীনঃ স্মৃতিহীন অচিন আঁধার)
টেমস নদীর তীরে দীর্ঘ দিবস ও রজনী কাটালেও মিলাদের মনে সর্বদা সুরমার ঢেউ এসে আলোড়ন তোলে। ‘স্বপ্নেরা মরে গেলে সকাল দুপুর/ মধ্যাহ্নে সাজ করে ঈশানের ঝড়/ সন্ধ্যার জলে ভাসে গোলাপ বকুল/ রাত্রির খোয়াড়ে জমা স্মৃতির খড়/ সুরমার নদীজলে মন অতিথি/ ফেরি করে জীবনের স্বপ্ন প্রতীতি।’ (মন অতিথিঃ কবিতার চেক বই)
অবশ্য স্বদেশের প্রতি মিলাদের ভালোবাসা নিছক মানবিক আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার কবিতায় এর সাথে সর্বত্র একটি বলিষ্ঠ অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছে। আধুনিক কবির ইতিহাস সচেনতাকে তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক অব্যবস্থা স্বপ্নপীড়িত মিলাদের প্রবাস জীবনকে বিপর্যস্তô করে দেয়। ‘আমি বুঝতে পারছি কোথাও না কোথাও ভুল হচ্ছে, বন্ধ্যা রমণীর মলিন দুঃখ নিয়ে কাঁদছে বুকের শীর্ণ নদী/ বিরহের চাঁদর গায়ে কাঁদছে জীবনের প্রেমপত্র, নিশীত রাত/ নগ্নবুটের লাথি খেয়ে কাঁদছে স্বাধীনতা, ত্রিশ লাখ করোটি/ চব্বিশে জানুয়ারীর রক্তাক্ত দাগ নিয়ে জ্বলছে চট্টলা, সুস্থ বিবেক/ নুর হোসেন, বাবুলের তরতাজা লাশ বুকে কাঁদছে বাংলাদেশ/এ সমস্তôটাই আমার ভুল, ভুলের একেকটা উৎকৃষ্ট উহার।’ ( কোথাও না কোথাও ভুল হচ্ছেঃ আর যদি একটা গুলি চলে)
মিলাদ স্বপ্ন দেখেন একটি সুখী-সুন্দর বাংলাদেশের যেখানে মানুষ স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ উপভোগ করবে এবং কোন প্রকার শোষণ ও বঞ্চণা থাকবেনা। ‘নারী ও নদীর প্রশংসার চাঁদরে ঢাকিনা গোপন ক্ষত/ শব্দের ঘাড়ে শব্দ তুলে কি লাভ বানিয়ে নির্মল পথ/ যদি নিরাপদে হাঁটেনা সেথায় সুপ্রিয় পথিক/ মুক্ত আকাশে সহজে ওড়েনা যদি প্রাণের শালিক/ আমার একেকটি রাত কাটে চরম দ্বন্দ্ব ও দ্বিধায়/ এই বুঝি স্বদেশের শাসনতন্ত্রের মলাট বদলায়/ যখন আমার ঘামের ফসল যায় মহাজনের ঘরে/ আমার বুক ভরা সুখটুকু শোষকেরা নেয় কেড়ে।’ (পুতুলের জন্য কবিতাঃ আর যদি একটি গুলি চলে)
সুখী-সুন্দর বাংলাদেশ গঠনের প্রয়োজনে মিলাদ বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন, সে স্বপ্ন বাস্তôবায়নে দেশের সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের মিছিলে তিনি শামিল হতে উদগ্রীব। একাত্তরের চেতনা ধারণ করে যারা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চায় তাদের সাথে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত মনে করেন। তিনি উচ্চারণরণ করেন, ‘মিলাদ তবুও তোমাকে একবার যেতে হবে/ আকাংখার বর্ণাঢ্য নদীর কিনার ঘেঁষে ঘেঁষে/ জমায়েত মানুষের মাঝে, খোলা ময়দানে/ অন্তôতঃ আরো একবার/ নিজেকে বিপ্লবী করে তোল - সশস্ত্র আয়োজনে। (মিলাদের মুখোমুখিঃ আর যদি একটা গুলি চলে)
আতাউর রহমান মিলাদের সাম্প্রতিক কবিতায় কিছুটা পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করছি। শব্দ চয়ন এবং কবিতার শরীর নির্মাণে তিনি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগী। আমার বিশ্বাস, বক্তব্য এবং কবিতার মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টির মুহুর্তে কবিতাকে অধিকতর প্রাধান্য দেয়ার ব্যাপারে আরো সতর্ক হলে মিলাদ কবিতাকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে সক্ষম হবেন।

সফিয়া জাহিরঃ নকশী কাঁথার কারিগর
স্বদেশের স্মৃতিমুগ্ধতা নিয়ে সফিয়া জহির বুনন করে চলেছেন কবিতার নকশী কাঁথা। দীর্ঘদিন বিলাতে অবস্থান করার পরও সংবেদনশীল শৈল্পিক চেতনা তাকে স্বদেশের দিকে বার বার টেনে নিয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা, স্বাধীনতা যুদ্ধের অঙ্গীকার, সাধারণ মানুষের জীবনযন্ত্রণা ইত্যাদি তার কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ। সফিয়া কম লেখেন, তবে তার লেখার মধ্যে পরিচ্ছন্নতার ছাপ সুস্পষ্ট। তার কোন কাব্যগ্রন্থ এখনো প্রকাশিত হয়নি। তাই বিভিন্ন সাময়িকীতে প্রকাশিত কবিতাই হবে বর্তমান আলোচনার প্রধান অবলম্বন।
স্বাধীনতা যুদ্ধের নাম না জানা এক সৈনিকের স্মরণে তিনি লিখেছেন ‘শূন্যতায় তুমি’। সেখানে তিনি একজন স্বজনহারা মহিলার বেদনাবিধূর স্মৃতি ও নৈঃসঙ্গচেতনাকে শৈল্পিক ভাবে উপস্থাপন করেছেন। যে চলে গেছে সে আর ফিরে আসবেনা জেনেও প্রিয়জনের জন্যে ঐ রমনী রাত্রিভর প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে। দীর্ঘ রাত্রি প্রতীক্ষার পর আবার তিনি নিজেই নিজেকে সান্ত্বনার বানী শোনাচ্ছেন, ‘শুনেছি বেঁচে নেই তুমি/ কি করে আসবে ফিরে? কেঁদে ওঠে নারী/ একজন আদর্শ দেশ প্রেমিক/ বেঁচে থাকতে পারে কি কোনদিন?’
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি, আইনশৃংখলার অবনতি এবং নিম্নবিত্তের জীবনযন্ত্রণার পাশপাশি উপর তলায় বসবাসকারী একশ্রেণীর মানুষের ঘৃণ্য চরিত্র উঠে এসেছে তার ‘ওরা কাদের প্রেতাত্মা’ কবিতায়। ‘যে কিশোরী বই-খাতা-কলম হাতে/ পা বাড়ায় বিদ্যার্জনে/ তার শরীরের মাংস ছিড়ে খায় উল্লাসে/ উন্মাদ বুনো শূয়োর। যে শিশু ওম খুঁজে মার বুকে/ খুঁজে ভালোবাসা, খুঁজে স্বাধীনতা/ আর সুনাগরিকেত্বের ন্যায্য অধিকার/ তার লাশ পঁচে গলে মিশে যায়/ ডোবা পুকুর জলাশয়ে •• •• •• ।’ ‘চিয়ার্স আপ’ ঠিক একই মেজাজের ভিন্ন একটি কবিতা। সেখানে তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার একটি নিখুঁত চিত্র অত্যন্তô আবেগময় ভাষায় অংকন করেছেন। এক দিকে ক্ষুধার্ত মানুষ না খেয়ে মারা যায়, অপুষ্টিতে ভোগে, ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া খাদ্য নিয়ে কুকুর ও মানুষ কাড়াকাড়ি করে, কবরে শায়িত হয় কাফনহীন গুলিবিদ্ধ লাশ; অপর দিকে ধনিক-বনিকেরা রঙ্গশালা সাজায় এবং মদ আর নারী নিয়ে নৃত্য করে। এখানে সফিয়াকে পাই আমরা এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে। পুজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় গুটি কয়েক মানুষ নিজেদের ভোগলিপ্সা চরিতার্থ করার জন্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে অসহায় অবস্থার মধ্যে ঠেলে দেয় - বৈষম্যমূলক এ অব্যবস্থাকে সফিয়া তীব্রভাবে কষাঘাত করেছেন তার কবিতার মাধ্যমে।
সফিয়া জাহির ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করে খুব হৃদয়গ্রাহী কবিতা রচনা করতে পারেন। ‘শব্দ নেই কবিতা নেই’ শীর্ষক কবিতায় সাধারণ আটপৌড়ে কথা বলতে বলতে অকস্মাৎ উচ্চারণ করেন, ‘জনকের মৃত্যু, একটি স্বপ্নের মৃত্যু/ স্বাধীনতার মৃত্যু/ বিচারক নেই বিচার নেই/ নেই নেই নেই/ কিছুই যে নেই।’
‘দিদিমা সেই কথা বলো’ কবিতায় সফিয়া একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখেছেন। সে স্বপ্ন সুখে থাকার স্বপ্ন, দুধ-ভাত আর গানের স্বপ্ন। তিনি বলেন, ‘তুমি সুন্দরের স্বপ্ন চাও - তোমার নিঃশ্বাসে ফুলকলিরা পাখা মেলে/ সুবাস ছড়াতে থাকে/ নক্ষত্রেরও জন্ম হয় সেই সাথে। •• •• •• •• দিদিমা সেই কথাই বলো/ যখন তোমরা ছিলে রাজসুখে/ দুধে আর ভাতে/ গানে আর ছন্দে।’
‘নেকড়ে ও বাজপাখি’ একটি প্রতীকধর্মী কবিতা। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে না বললেও কবিতাটির প্রসঙ্গ যে মুক্তিযুদ্ধ তা বুঝতে কারো অসুবিধা হয়না। ‘তোমার জন্যে বুনেছি নকশি কাঁথা’ অপর একটি সুন্দর ও ঝরঝরে কবিতা। পনেরো লাইনের ছোট্র এ কবিতায় জন্মভূমির প্রতি তার আবেগ ও ভালোবাসা বাঙময় হয়ে ওঠেছে। ‘তোমার জন্য/ এনেছি অজস্র জয়গাঁথা/ বায়ান্ন, উনসত্তর আর স্বাধীনতা/ পদ্মার রূপালী ঢেউ, গীতাঞ্জলী আর সঞ্চয়িতা/ নক্‌শী কাঁথা।’
সফিয়া জাহিরের শব্দ চয়ন পরিমতি, ভাষা ঝরঝরে এবং সহজ। আমার প্রত্যাশা - প্রচুর সম্ভাবনাময় এ কবি পেশাগত ব্যস্তôতাকে কিছুটা বিন্যস্তô করে কবিতার প্রতি আরো একটু মনোযোগী হবেন।

শাহ্‌ শামীম আহমদঃ শব্দের নদীতে মুগ্ধ মাছরাঙা
তরুণ প্রজন্মের কবি শাহ্‌ শামীম আহমদ ‘অজ্ঞতার গহীন অন্ধকার’ থেকে ‘আলোর টানেল’ ধরে যাত্রা শুরু করেছেন ‘হীরকে’র সন্ধানে। ‘ঝিনুকে’র সবটুকু যন্ত্রণা বুকের গভীরে পোষে তিন আনন্দের ‘শুভ্র-ভ্রূণ স্বপ্ন-রেণু’ নির্মাণ করছেন ‘শিল্পের শহরে’। শব্দচাষের ব্যাপারে শাহ্‌ শামীম অঙ্গীকারাব্দ এবং ‘ত্যাগের আতর-সুবাসে’ তিনি নিজেকে বিমোহিত করে রাখতে সচেষ্ট। তার ভাষায়, ‘এজিন পেয়েছি আমি করে যেতে শব্দের চাষ/ বিশ্বাসের বর্ম হাতে ভেঙ্গেছি অবিশ্বাসের কাঁচ/ নেমেছি শিল্পের শহরে। বোধের বাতি ঘরে জ্বালি আশার প্রদীপ/ একটি বার আলোকিত হবো ইহকালে। ভেতরে অন্ধকার - অন্ধ আতঙ্ক ও ভয়, ক্ষুধা ও তৃষ্ণার দাস এই নশ্বর শরীর, ত্যাগের আতর-সুবাসে কি করিব মোহিত?’ (এজিন পেয়েছিঃ জলরঙা দিন)
শব্দের চাষাবাদে শাহ্‌ শামীম একজন অক্লান্তô কৃষক। প্রবল তৃষ্ণা নিয়ে তিনি বোধের সমুদ্রে সাঁতার কাটেন। ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তিনি মহাশূন্যের পথে যাত্রা করেন, কোন সময় আলোকের অন্বেষণে সৌরচুল্লিতে নিজেকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেন। ‘শূন্য থেকে শূন্যে ভেসে যাই, চাঁদের শরীর থেকে পান করি জ্যোৎস্নার মদ/ কল্পলোক থেকে তুলে আনি মুঠোমুঠো স্বপ্নের কথা/ •• •• •• শব্দে শব্দে ভাঙাগড়া - কল্পনায় হয়ে ওঠে রাঙা/ শব্দের নদীতে আমি এক মুগ্ধ মাছরাঙা।’ (আত্মপরিচয় - ১) এ লাইন পাঠ করার সাথে সাথে আমাদের মন চলে যায় শৈশবের স্মৃতিঘেরা গ্রামের বাড়িতে। আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে বর্ষাকালে গাছের ডালে বসে থাকা বাংলার সৌন্দর্য মাছরাঙা পাখি, এর রঙিন ঠোঁট ও পালক এবং সর্বোপরি এর ধ্যানমগ্নতা।
স্বপ্নচারিতা কবিদের বৈশিষ্ট্য। কবি তার নিজের স্বপ্নকে নববধূর মতো সাজ-অলংকার দিয়ে সাজান, নিজস্ব কাব্যিক ভাষার মোড়কে উপস্থাপন করেন পাঠকদের সামনে। সফল কবি নিজের স্বপ্নকে সার্থকতার সাথে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন, আন্দোলিত করতে পারেন অন্যদের মন ও মনন। শাহ্‌ শামীমের মধ্যে জাত কবির স্বপ্নচারিতা পুরোপুরি বিদ্যমান এবং আত্মতার আবরণকে তিনি সহজেই সামষ্টির প্রাঙ্গণে সাফল্যের সাথে ছড়িয়ে দিতে পারেন। শামীমের স্বপ্ন হার্দিক রক্তক্ষরণে পরিপুষ্ট, মননশীলতায় সমৃদ্ধ এবং প্রেম-ভালোবাসায় আর্দ্র ও উষ্ণ। তার প্রেমিক হৃদয় কখনো বন্দনা করে দেশমাতৃকার, কখনো উদ্বেল হয়ে ওঠে প্রেয়সীর জন্যে, আবার কখনো মরমী সাধকের মতো স্রষ্টার ধ্যানে বিভোর। তবে কবিতাই তার আসল আরাধ্য এবং মননের উন্নয়ন ও পরিশুদ্ধিই তার আনন্দ।
প্রেয়সীর উদ্দেশ্যে শামীম বলেন, ‘তোমার পায়ের শব্দে/ হৃদয়ের তারগুলো বাজে যেন হাজার সরোদ •• •• প্রথম চুম্বন যেন ঘোরলাগা সুখের বিদ্যুৎ। তোমার স্পর্শছোঁয়া অনিন্দিত আমার প্রহর।’ (মনে পড়ে মধুসন্ধ্যার স্মৃতি) কবিতার প্রতি তার উচ্চারণ, ‘হিরন্ময় সেই সব আলোকিত দিনে/ অবুঝ স্বপ্ন নিয়ে জ্বলে উঠতাম বারুদের মতো/ চমৎকার সব রাত্রিকে জাগিয়ে দিতাম আলোর ঝলকানিতে/ আজও ইচ্ছে করে পৃথিবীকে উজ্জ্বল করে দেই সেই সব রাত্রির মতো, ইচ্ছে হয়/ চমৎকার আগুন হাতে নিয়ে নেমে পড়ি/ বিশুদ্ধ কবিতার শহরে।’ (সেই সব আলোকিত দিন) শব্দসুন্দরীর কাছে তার প্রার্থনা, ‘প্রার্থনায় দু’হাত তুলে, ক্রমাগত ঠুকতে থাকি শব্দের পাথর/ অধীর আঘাত করে ভেঙে দিতে চাই, সত্ত্বার কাঁচঘেরা ঘর। ভাবের নিশ্চিদ্র শহরে এক সুরম্য প্রাসাদ/ দরজায় দাঁড়িয়ে আমি অন্ধ ভিখারি, খোল হে মদির মেয়ে - খুলে দাও/ প্রসবের দ্বার।’ (খোল হে মদির মেয়ে) কবিতা তার কাছে ‘নারীর জরায়ূ ছাড়া স্থাপত্যরীতির আশ্চর্য নির্মাণ’। তার শ্রীচৈতন্য মন ‘নৌকার পাটাতনে বসা খাসিয়া রমনীর/ বুনো ফলের মতো দেহমদ’ এবং ‘মুরং যুবতীর পিঠে ঝোলা দুধের ছাওয়াল’ দেখে উদ্বেলিত। বোনের উদ্দেশ্যে তার উচ্চারণ, ‘আপা তোর মিটিমিটি হাসি আজ/ চাঁদের মতো মনে হয়।’ মা’কে লক্ষ্য করে বলেন, ‘তুমি যখন আমার মাথায় হাত রাখো/ বসন্তেôর অসম্ভব প্রকৃতি ফুলের সৌরভে/ ভরে ওঠে সূর্যের অপার লাবণ্যে/ আমার সমস্তô পৃথিবী।’
শামীম যখন স্রষ্টার আরাধনা করেন তখন তিনি এক মরমী সাধক। এ ধ্যান তার একান্তô আত্মার এবং তা ‘আজীবন বিশ্বাসে প্রোথিত অনঢ় জমিন’। ‘শান্তিôর সুশীতল প্রচ্ছায় রক্ততরঙ্গে ডাকে সত্যের বাণী, অথচ লোভাতুর করে রাখে অন্ধ দ্বন্দ্বময় পাপক্লিষ্ট জীবন। নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে পাবে কিছ সুখ।’ (আরাধনা শুধুই তোমার) স্রষ্টার অ্বেষণনে যারা গায়ে ছাই মেখে পাহাড়-পর্বতে এবং পথে-প্রান্তôরে ঘুরে বেড়ায়, গাছের নিচে বসে ধ্যানমগ্ন হয়ে তপস্যা করে, শামীমের দৃষ্টিতে অবশেষে তাদের প্রাপ্তি শুধু হয় দীর্ঘ পদযাত্রার ক্লান্তিô। তার মতে, ‘মানুষ! তোমার সাধনা/ কেবলই পূর্ণতা পায়/ পরম ঈশ্বর মানুষের হৃদয়ে ঘুমায়। (মানব সাধন) শেষ বাক্যটির সাথে আমরা পারস্যের এক সুফি-কবির লেখা - আসমান-জমিনে আমার স্থান সংকুলান হয় না, কিন্তু মুমিনের হৃদয়ে আমার স্থান হয় - কাসিদার সাথে মিল খুঁজে পাই। শামীম তার জলরঙা দিন কাব্যগ্রন্থ শেষ করেছেন প্রভূর কাছে প্রার্থনা করে, ‘পাপের গলিত ড্রেনে ডুবে গেছি/ লোভী মাছি হয়ে/ এই নরক পুকুরে •• / হাশরের এজলাসে/ তুমি হলে দয়ার সাগর/ প্রভূ •• / এই অধমেরে করিও ক্ষমা।’ (এই অধমেরে করিও ক্ষমা)
শামীমের স্বপ্ন সুন্দর একটি জীবনের স্বপ্ন, একটি আলোকিত সময়ের স্বপ্ন। অনুচ্চ উচ্চারণে তিনি তার স্বপ্নের আলোকিত ভোরের দিকে আমাদের নিয়ে যেতে চান, ‘আলোকিত ভোর, উজ্জল দুপুর - চাই জীবনের সব সমাধান; বুকের রক্তে লিখেছি জীবনের গান - উড়িয়েছি বিজয় নিশান।’ (অন্ধকার নেমে আসে) বলাবাহুল্য তিনি এখানে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ইঙ্গিত করছেন। তিনি মানুষের কল্যাণে কলম হাতে হয়েছেন ‘তীর্থের সহযাত্রী’। তার ঘোষণা, ‘আজন্ম বিপ্লবী আমি - বিপ্লবের বীজ ছড়াবোই - মানুষের দিকে মুখ ফেরাবোই/ •• •• আকাশের দিকে তুলে ধরো মাথা - অফুরন্তô আলোর দিকে, দূরন্তô দুপুরের দিকে। (দূরন্তô দুপুরের দিকে) শাহ্‌ শামীমের মতো মানবতার কল্যাণে অফুরন্তô আলো আর রৌদ্রোজ্জল দুপুর আমাদের সকলেরই কাম্য।

আবু মকসুদঃ স্মৃতিকাতর মধুমাছি
বিলাতের সাহিত্য প্রেমিকদের কাছে ‘শব্দপাঠ’ গোষ্ঠী এবং এর সাথে জড়িত তিন রত্ন - আতাউর রহমান মিলাদ, আবু মকসুদ এবং কাজল রশীদ - কবিতা চর্চার পাশিপাশি সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। কবিরা সংগঠন বুঝেন না, বিশেষ ভাবে আবু মকসুদ যেন এর জীবন্তô প্রতিবাদ। এক সময় তিনি ছড়া লিখে সুনাম অর্জন করেছেন। তার ছড়া-কবিতা নিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘নটার ট্রেন কটায় ছাড়ে’ পাঠকদের বেশ সমাদর পেয়েছে।
ইদানীং আবু মকসুদ কবিতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছেন। তবে এখনো তার কোন কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। আবু মকসুদ কবিতার মাধ্যমে চিত্র অঙ্কন করেন, গল্প লিখেন। তার অঙ্কিত ছবির মধ্যে আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষকে আমরা দেখতে পাই, দেখতে পাই নিসর্গ, তির্যক মন্তôব্য পাই সমাজ এবং রাষ্ট্রে প্রচলিত ভন্ডামীর বিরুদ্ধে। তিনি নিজের মনে নিজের কথা বলে যান। নিজের কথার ফাঁকে ফাঁকে আমাদের সকলের কথা ফেলেন।
আবু মকসুদের কবিতায় কাহিনীকাব্য নেই, আছে ভাবের রাজ্যের নানান কথকতা। তার ‘চলো সখি’ কবিতা এমনি একটি কথকতা। ‘আধখানা চাঁদ নিয়ে, আঁচলে জমানো ভোর, গোধূলি, সন্ধ্যা তিলক ••’ - এ ভাবে কাহিনীর শুরু। আধ খানা চাঁদ খুব সাত সকালে দেখা য্‌য়, আবার সন্ধ্যায়ও উদিত হয়। খুব ছোট এ কবিতায় তিনি অনেক কিছু টেনে এনেছেন। এনেছেন পাহাড়ের গায়ে খোদাইকৃত প্রাগেতিহাসিক স্মৃতি, শাকচুন্নি, শঙ্খচূড়, পেরেকগাথা বুক, কাজল দীঘি, জলের পাশে বুনো ফল, ঘিয়ে ভাত, জানালায় দেখা মুখ ইত্যাদি। সব শেষে তিনি নাগরিক যন্ত্রণার কথা, মিথ্যার বেসাতির কথা বলেছেন, এবং নগর জীবনকে পেছনে ফেলে গ্রামের স্মৃতি জড়ানো মেঠো পথ ধরে দৌড়ানোর প্রত্যয় নয় - আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছেন। ‘পরিচয়’ কবিতায় তিনি একটি বেওয়ারিস লাশের গল্প বর্ণনা করেছেন। এ লাশ ইউরোপীয় কোন দেশের, বিলাতের হলেও বাঁধা নেই। তার ছিন্নভিন্ন পাকস্থলী বিলাতি মদের নির্যাস, নিজের চোখের বদলে সেখানে কোন সুন্দরী নারীর চোখ লাগানো, ঠোঁটে হাভানা চুরুটের গন্ধ, পরনে আফ্রিকার পোশাক, কিডনীও তার নিজের নয় - ধার করা, সাথে পাওয়া গেছে খলিল জিবরানের ছবি, বুকপকেটে কৃষ্ণকায় মারিয়ার ছবি। লাশকাটা ঘরের লোকেরা লাশের পরিচয় পেতে হিমশিম খাচ্ছে। সবশেষে হৃদয়ের পোস্টমর্টেম করে জানা গেলো বেওয়ারিশ লাশ একজন বাঙালি ব্যক্তির। এ কাহিনীর মাধ্যমে লেখক বাঙালিকে হৃদয়িক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পেয়েছেন।
কবিরা শব্দ নিয়ে খেলা করতে ভালোবাসেন, বড় মাপের কবিরা নতুন শব্দ তৈরি করেন, আটপৌরে শব্দকে নতুন দ্যোতনায় প্রতিস্থাপন করেন। তারা অনেক সময় আমাদের আটপৌরে শব্দকে কখনো আরেকটি বিপরীত অর্থবোধক শব্দ এর সাথে জুড়ে দিয়ে ভাববৈচিত্র সৃষ্টির প্রয়াস পান। আবু মকসুদের কবিতায় এ প্রয়াস লক্ষ্য করার মতো। তিনি মাঝে মাঝে বাক্যের মধ্যখানে একটা বিপ্রতীপ শব্দ বা শব্দ সমষ্টি জুড়ে দিয়ে পাঠকের মনকে ধারাবাহিক চিন্তôা থেকে অনেক দূরে নিয়ে যান। অবশ্য জোড়া শব্দ দিয়ে নতুন ভাব সৃষ্টির অতিমাত্রিক প্রচেষ্টা পাঠকদের অনেক সময় বিরক্তির কারণ হতে পারে। আবু মকসুদের ‘ফিরা-কথা’ শীর্ষক ছোট একটি কবিতায় আমরা পাই অনেকগুলো জোড়া শব্দ, বালুকাবেলা, বিচলন মন, প্রবাল অভিমান, অভিমান হাওয়া, পলাশ পুরুষ প্রভৃতি। তবে এ কবিতার শেষ দুটো লাইন আশ্চর্য সুন্দর, ‘ফিরে আসি নুড়িপাথরের টানে, বাঁচার অহংকারে/ বাকি ভগ্নাংশটুকু মুক্ত হোক, যুক্ত হোক তোমার উত্তাপে।’
‘জল’ আবু মকসুদের একটি প্রিয় প্রসঙ্গ। বহু কবিতায় তিনি নানা ভঙ্গিতে জলের উপমা ব্যবহার করেছেন। যেমন, ‘জলরেখা’ কবিতায় জল শব্দটি বার বার উল্লেখিত হয়েছে। যেমন, ‘যে জলে জ্যোৎস্না হাঁটে খুঁজি তারে জলের ভিতর’ ‘এই জল কালিন্দীর জল’ ‘বেহুলা বেহশ জাপটে জলরেখা’ ‘জলের আগুনে পুড়ে’ ‘ছিন্নভিন্ন বৈধব্যের জলরেখা’; ‘নারীবাদী ভ্রুণ’ কবিতায় ‘পুকুরের জলে নারীবাদী ভ্রুণ সাঁতার কাটছিলো’ ও ‘পরদিন পুকুরের জলে জলকাদার পিরিত পাতায়।’ জলের আগুনে বাস্তôবে আমরা কখনো পুড়িনা, কিন্তু কবির জন্যে সেটা সম্ভব এবং সম্ভব যদি রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় জলের উপাদানে পরিবর্তন সাধন করা হয়। জাফরানী রোদে আবু মকসুদ মনুর তীরে বসে থাকেন এক গামলা জলের আশায়। প্রণয় কাব্যে তার উচ্চারণ, ‘তোমার উঠান ধানে ভরা সোনালী তার ঢেউ/ ঢেউ টলমল মন সায়রে উছলে পড়া জল।’
আবু মকসুদ শব্দ নিয়ে খেলা করেন স্মৃতির জাম্বিল খুলে ধরে। শৈশবের মধুময় স্মৃতি, স্বদেশের প্রতি দেশপ্রেম মিশ্রিত স্মৃতিকাতরতা, প্রবাস জীবনের বৈরী পরিবেশ এবং সর্বোপরি জীবন ও জগত সম্পর্কে আন্তôর্দৃষ্টি - সব কিছু মিশ্রিত হয়ে আছে তার কাব্য প্রতিমার পরতে পরতে। ‘মধুমাস শীত এলে খুঁটে খায় পোকার শরীর/ বৈষ্ণবী, যোগী, হাতে নেয় ফুলের বাগান/ মধুমাস চলে গেলে পাখিরা মরে যায়/ স্মৃতিরা ঠোকরায়, মন যায় ফের মন্থনে বিহারে।(মধুমাস) ‘স্মৃতির মৌমাছি’ কবিতায় আবু মকসুদ শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত ঢেউপাশা ফিরে যাবার স্বপ্ন দেখেছেন। ঢেউপাশা কোন প্রতীকী ব্যঞ্জনা ধারণ করছে কি না আমাদের জানা নেই । তবে ঢেউপাশার বর্ণনা পাঠ করে পাঠক মাত্রই আপ্লূত হতে বাধ্য। ঢেউপাশা শুধু স্মৃতি বহন করার কারণে তার কাছে নন্দিত নয়, এলাকাটি তার কাছে আশায় উজ্জীবনের স্রোত। ‘ঢেউপাশার জননীমেঘ কোমলবাহু জলকনাবাহী স্বপ্নের প্রান্তô/ সবিতার খোলাচুল আর কালোমেঘ ঢেউপাশার অমর ইশারা/ বহু আগেকার ঢেউপাশা গাছের পায়ের কাছে জমানো ধূলো/ এমন নজরকাড়া রাঙাপরীদের ঝাঁক পরীরা ভোরের রোদ্দুর।’ আবু মকসুদ তার বর্তমান জীবনের ম্লান ও দূøতিহীন সময়কে ঢেউপাশার মধুময় স্মৃতির সাথে এ ভাবে তুলনা করেন, ‘এখনকার এই আবরণহীন অবুঝ উষ্ণতা বুকে জগদ্দল পাথর/ ঢেউপাশার ঘোরলাগা সেই পরম তৃপ্তি, পরমান্ন, ভরাট আবাদ/ আকাশের শুয়ে থাকা দিগন্তôনীলে প্রজাপতি চোখের শিশির/ ঢেউপাশা কুজ্বটিকা আবরণহীন উদাস দুপুরে স্মৃতির মধুমাছি/ এই খসখসে রোদে স্মৃতিতে ঢেউপাশা আর চন্দ্রবোড়া সাপ/ স্মৃতির মধুমাছি রোদ্দুরে হেঁটে যায় বিগতের পাপ।’
আবু মকসুদ অত্যন্তô সচেতন ভাবে মননের চর্চা করেন এবং এ কারণে তার কবিতায় নানা ভাবে উন্নত জীবনবোধ ও মানবতাবোধের গান ধ্বনিত হয়েছে। মূল্যবোধের বিপর্যয়, বিপন্ন মনন এবং রাজনৈতিক অনাচার তাকে ব্যথিত, এবং কখনো ক্ষুব্ধ করে। তবে অসুয়া-অসুস্থতা তাকে বিক্ষুব্ধ করলেও হতাশা গ্রাস করতে পারেনি। অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ক্ষোভকে তিনি শিল্পের মোড়কে উপস্থাপন করতে সক্ষম। মানবচরিত্রের অন্ধকার দিক প্রত্যক্ষ করে তিনি এ বলে আমাদের প্রবোধ দেন, ‘মানুষ জন্ম নেয় মহারৌদ্রে পৌঁছাতে তীরে/ অমানুষ বাঁদরেরা সব কালেই মুখ রাখে বিষ্টার ভীড়ে’। (কবির বেদনা) তাঁর আহ্বান, ‘হে আলোকের সাথী ফিরে আসো, এখন পাথর সময়/ নতুন অধ্যায়ের শুরুতে শেষবার করে নাও ফাতেহা পাঠ।’ (পাথর সময়)

সৈয়দ মুহাম্মদ আলী রুম্মানঃ কুশলী শব্দচাষী
সৈয়দ রুম্মানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘টেক্কার তালে দুলি ••••• যখন আকাশ ডানাবৎ হিরণ্য মেয়ে বোরখা পরে’ প্রকাশিত হয় দু’ হাজার সালে। গ্রন্থটির ব্যতিক্রমধর্মী নামকরনের মাধ্যমে তিনি সহজেই পাঠকদের দৃষ্টি কেড়ে নেন। পাঁচ বছর পর ৫৬টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘চলে গেলে নিয়ে যায় সব’। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের মোড়কে প্রদত্ত বক্তব্যটি বিবেচনার দাবি রাখে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘সৈয়দ মুহাম্মদ আলী রুম্মান, নব্বইয়ের জ্যোতির্ময় আবির্ভাব, শক্তিমান আধুনিক তুখোড় মেধাবী তরুণ কবি, মাটি ও নিসর্গ যার উপাদান, অতীত পুঁজি, সমকাল উজ্জল অভিধান, প্রেম ও নারী বিশ্বজনীন অনুভূতি। আনন্দ ও বেদনার শৈল্পিক মিশ্রণে নির্মান করেন কবিতা যেখানে তার ক্ষোভ ও দ্রোহ মূর্ত হয়ে ওঠে সকল অসঙ্গতির বিরুদ্ধে।’ এখানে সৈয়দ রুম্মানকে যে সকল বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে এর সবগুলোর সাথে আমাদের একমত না হলেও চলে। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে তার কাব্যের মৌল উপাদান মানুষ ও নিসর্গ এবং তিনি আনন্দ ও বেদনার শৈল্পিক মিশ্রণে কবিতা নির্মান করেন বিধায় পাঠকরা তাকে অবশ্যই মনে রাখবে।
কবিতাকে সাথে নিয়ে দীর্ঘপথ অতিক্রম করার সম্ভাবনা নিয়ে বিলাতে যারা কবিতা চর্চা করছেন তাদের মধ্যে সৈয়দ রুম্মান অন্যতম। কম কথায়, ইঙ্গিত বা চিত্রকল্পের মাধ্যমে অনেক না বলা কথাকে বলিষ্ঠভাবে তিনি বলতে পারেন। ‘বহুত মানুষ ঘুরে, দেখিনা মানুষ তবু - এ কি বিষ্ময়! নেকড়ে আমার মিত্র; জগৎ শাসন করে - শৃগাল হৃদয়।’ বক্তব্যের প্রয়োজনে বাড়তি শব্দের ভার দিয়ে তিনি কবিতার শরীরকে বেঢপ বা স্থূল করে তুলেন না। ‘মঞ্চে ক্লান্তô কুশীলব, বাতিঘর দূ েদোলে’ পোহায় না সরীসৃপ রাত; এ কী দিলে প্রমিথ্যুস! শূন্য সমাচার মেখে কতকাল উর্ধে রাখি হাত?’ অভিজ্ঞ চাষীর মতো তিনি কবিতার জমিন লাঙ্গল দিয়ে খুঁড়েন, নিড়ানী দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করেন, বাছাই করে ভালো জাতের বীজ বপন করেন এবং তারপর সার ও পানির আদর-যত্ন দিয়ে চারাগাছকে আস্তেô আস্তেô বড় করে তুলেন। এ ভাবে যত্নের সাথে লালনের কারণে সৈয়দ রুম্মানের সাবধানী হাতে অতি তুচ্ছ এবং অকিঞ্চিতকর বিষয়ও কবিতার উপভোগ্য উপকরণে পরিণত হয়।
‘চিলের খোঁজে বিষন্ন মাঠ’ রুম্মানের একটি সার্থক সনেট, ‘যতখানি মেঘ আকাশ ধরেছে রেখে/ সেইটুকু দিয়ে ভরবেনা দুই চোখ/ চিরাচরিত সে গল্পকে হাতে মেখে/ ছুঁড়ে দিয়ে পথে পাও তুমি কি যে সুখ!’ এটা কি ক্রন্দনের আকাঙ্খা, না চোখের ক্রন্দনোত্তর পিপাসা? কারণ যা-ই হোক, পরিমিত শব্দ দিয়ে সীমাহীন দু;খবোধ প্রকাশের শৈল্পিক এ প্রয়াস পাঠকের মনকে অবশ্যই স্পর্শ করবে। তার আকাঙ্খা, ‘কাতর কিষাণ উর্বর মাঠে চাই - বুনে যেতে প্রেম - স্পার্টাকাসের গান।’ কিন্তু তার আকাঙ্খা অপূর্ণ থেকে যায়, চিলের খোঁজে তার নিদ্রাহীন সময় কাটে। তবে নিশ্চুপ থেকেও অনেক কথা বলা যায় এ সত্যের স্বীকৃতি দেন তিনি অকপটে, ‘নিশ্চুপ আমি অনেক বলেছি কথা/ কল্পিত ছবি স্পর্শে লজ্জা পায়, মেঘলা মাটিতে শামুকের রসিকতা••/ ঝাপসা দু’চোখ ভালোবাসা হাতড়ায়।’
কুশলী শব্দচাষী রুম্মানের কবিতার দৃষ্টিকাড়া বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার অধিকাংশ কবিতা উচ্চকন্ঠে পাঠ করা যায়। ছন্দোপতন বা অপরিমিত শব্দ প্রয়োগের দোষে দুষ্ট হবার কারণে পাঠককে বারবার হোঁচট খেতে হয়না। কবিতাকে মানুষের কাছাকাছি নিতে হলে তা হতে হবে সহজ আবৃত্তিযোগ্য। অধুনা অনেক কবির কবিতা বক্তব্যের বিচারে উত্তীর্ণ হলেও ছন্দোপতনের কারণে তা পাঠক-নন্দিত হতে ব্যর্থ হয়। রুম্মানের কবিতার শরীর নির্মানে শ্রবণেন্দ্রিয়কে সজাগ রেখে শব্দ এবং ধ্বনির মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করার মতো। তার টানা গদ্যে লেখা কবিতাও এক নিঃশ্বাসে পড়ে নেয়া যায়। দৃষ্টান্তô হিসেবে ‘চলে গেলে নিয়ে যায়’ কাব্যগ্রন্থের ‘দৈনন্দিন খোয়াব’ শীর্ষক কবিতাটি উল্লেখ করার মতো। ‘যখনো আসোনি তুমি তখনো অপেক্ষা নয়, প্রতীক্ষার শব্দপুঞ্জে তোমাকে বেঁধেছে কত বুনো হরিয়াল, •• •• •• যতই আদিতে যাই ততই স্বজন তুমি, কি করে তোমাকে বলো আদ্যোপান্তô পাল-ভাঙা জীবনে জড়াই!’
নিসর্গকে আশ্রয় করে রুম্মানের কবিতার শরীর বেড়ে ওঠে এবং তিনি নিজের মনের রঙ দিয়ে নিসর্গকে বাড়তি ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করেন। তার ‘উপেক্ষিত নিমন্ত্রণ’ একটি সুখপাঠ্য সনেট। রুম্মান সেখানে দুঃখবোধ এবং অন্যান্য মানবিক অনুভূতির কাব্যিক বর্ণনা দিয়েছেন। ‘হ্যামিলন’-এর প্রতীক্ষায় সৃষ্ট কবির বেদনার সাথে পাঠকমাত্রই একাত্মবোধ করবেন। এটা ফুল-চাঁদের কবিতা নয়, তাই নিসর্গ সেখানে এসেছে চিত্রের প্রয়োজনে। ‘নামে না মাটিতে চাঁদ, দুই হাত মেলে থাকে বেতের চেয়ার/ অবারিত ধূলি হাসে, গড়ে ওঠে আসবাবে প্রতীকী নগর/ দুইটি সচল নদী পলির প্রাচুর্য মাঝে খুঁজে খেলোয়াড়/ আঁধার, আঁধার ঢালে; যথারীতি ছুটে চলে মেঘের বহর।’ কাঙ্খিত চাঁদের প্রতীক্ষা থেকে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে রুম্মান একটার পর একটা চিত্রকল্প তৈরি করেন, - পাজরে ব্যথার ঘ্রাণ, স্বপ্নফুল জ্বলে পুড়ে কুঁকড়ায়, নিসর্গ নমিত আজ দুক্‌খে পরানের, ধুয়ায় গালিবী গান, কাকের পালক ঝরে শ্যামলিমা চোখে, সরীসৃপ ক্ষণগুনি, বিষন্ন মৃদঙ্গ বাজে ইত্যাদি। সারমর্ম ওঠে এসেছে শেষ দু লাইনে, ‘এক থোকা রোদ খুঁজি •• •• স্নানঘরে ভিজে যায় রঙিন রুমাল...হ্যামিলন কই গেছে...সেলাতে পারিনা আর প্রতীক্ষার পাল।