আতরজান ও শ্রীমান তালেব আলী
আজম ফারুক, মঙ্গলবার, জানুয়ারি ০১, ২০১৩


আতরজান ও শ্রীমান তালেব আলী
আজম ফারুক

আমার নাম শ্রীমান তালেব আলী। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। অর্থনৈতিক কারনে বিয়ে করা হয়নি। সাংবাদিকতা পেশা। পুরাতন ঢাকায় বেচারাম দৈউরী মেসে থাকি। আয় যা ব্যয় তাই। মাঝে মাঝে ধার করতে হয় বাড়তি কোন খরচ করতে হলে। এককালে হ্যান্ডসাম ছিলাম, এখন চুল কিছু পরে যাওয়ায় হ্যান্ডসাম দাবী করিনা ফিংগারসাম দাবী করি। আমার প্রেমিকা আতরজান। বয়স ৩৫ হবে। ২৩ বছর বয়েসে বিয়ে হয়েছিল। পাচ বছর আগে স্বামী মারা যায়। একটি নির্মানাধীন ভবনের ছাদ হতে মাথায় ইট পরে তার মৃত্যু হয়। আতরজান থাকে ময়মনসিংহ শহরে একটি স্কুলের পেছনে একটি হাফবিল্ডিং টিনশেডে। সপ্তাহে দুইরাত আমি তার সাথে কাটাই।
গত রোববার আমি যখন আতরজানের ঘরে প্রবেশ করলাম তখন রাত প্রায় দুইটা। আতরজান আমাকে একটি বৃত্তাকার বালিশে বসতে বললো। একটু পরেই একটা গামছা হাতে দিয়ে বললো টিউবওয়েল হতে হাতমূখ ধুয়ে আস। আমি হাত-মূখ ধুইতে গিয়ে গামছা পেচিয়ে গোছল করে ফেললাম। ইতোমধ্যে সে খাবার পরিবেশন করেছে। লাল শাক, মিস্টি লাউ ভর্তা, পুদিনা পাতা দিয়ে নলা মাছের মাথা। খাবার শেষে আমি পেন্টের পকেট হতে চার খিলি পান আতরজানের সামনে রাখলাম। সে মৃদুহাস্যে আমাকে ধন্যবাদ জানালো। পান মূখে দিয়ে এবারে আমি ওর শাড়ীর আচলে একটা কবিতা লিখতে শুরু করলাম।
কলমের ক্লিপে বিম্বিত পৃথিবী/ গান গায় শিশির ভোর স্বপ্নের নদী/ আমার চোখে কাঁদে বিশ্বজিতের ছবি/ এবারে সে আমার গালে একটি থাপ্পর মারলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম চড় মারলে কেন ? সে বেশ ক্ষোভের সাথে বললো খুব ভালো করেছি।
খুব ভালো করেছো মানে ? এতে কি আমি ব্যথা পাইনি ? এছাড়া আমার মুখের পানটা পরে গেলো।
আমি তোমাকে আরও পাচটা পান বানিয়ে দিবো। যেখানে ব্যথা পেয়েছো সেখানে পাচটা চূমুও দিবো।
কিন্তু চড় মারলে কেন ?
তুমি এই কবিতা লিখতে পারবে না।
কারন ?
এই কবিতা প্রকাশ হলে তোমাকে গ্রেফতার করবে। জেলে ঢোকাবে।
এতক্ষনে আমি বুঝতে পারলাম, সন্ত্রাসী ছাত্রদের হাতে নিহত বিশ্বজিতকে নিয়ে কবিতা লিখার কারনে তিনি ভয়ে আমার উপর এই কাজটি করেছেন। আমি তাকে বুকে জরিয়ে ধরে আদর করলাম। সে উঠে গিয়ে Economist নামে একটি British Magazine বের করে এনে Violation of human rights in Bangladesh নামে একটি Article পড়তে শুরু করলো। ইংরেজিতে সে আমার চাইতে ভালো। একটি মিশনারী স্কুল হতে এসএসসি পাশ করেছে। স্নাতক পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। যে স্কুলের পেছনে থাকে সেই স্কুলের আর্ট টিচার সে।
এবারে আমি ওর কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকলাম, আমরা বাংলাদেশের সব পুরুষরা যদি জেল-হত্যার ভয়ে লেখালেখি ও প্রতিবাদ করা বন্ধ করে দেই, তাহলে দুই স্বেচ্ছাচারী নারীর হাত হতে দেশটাকে বাচাবে কে ? (চলবে)