টিউলিপের বিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা এবং কিছু কথা
উর্মিরা করিম , বৃহস্পতিবার, জুলাই ১১, ২০১৩


প্রধানমন্ত্রীর লন্ডন সফরকালীন সময়ে তাঁর স্পেশিয়েল সিকিউরিটি ফোর্স এর(এসএসএফ)নিরাপত্বা দেয়ার যোগ্যতা দেখে বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন ক্ষুদে ব্রিটিশ-বাঙালি শিশুশিল্পীরা ও ব্রিটিশ সিকিউরিটি সদস্যরা।
রোববার বিকেলে পূর্ব লন্ডনের ইমপ্রেশনস ইভেন্টস ভেন্যু হলে প্রধানমন্ত্রীর একমাত্র বোন শেখ রেহানা কন্যা কাউন্সিলার টিউলিপ সিদ্দীকির বিবাহত্তোর সংবর্ধণায় প্রায় সাড়ে তিনঘন্টা উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইভেন্টস হল ও হলের বাইরে ব্রিটিশ সিকিউরিটি সদস্যদের পাশাপাশি দলীয় কর্মীরাও কঠোর ভাবে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্বার দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু অনুষ্ঠানে দায়িত্বরত এসএসএফ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের নমুনা দেখে অনেকেই বিষ্মিত হয়েছেন। এসএসএফ সদস্যরা অনুষ্ঠান চলাকালীন পুরো সময়ই কিভাবে আমন্ত্রিত অতিথিদের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে দুরে সরিয়ে রাখা যায় সেই চেষ্টাই ছিলেন ব্যস্ত।
কিন্তু শেখ হাসিনার মত একজন উচ্চ নিরাপত্বা ঝুকির ভিভিআইপি’র নিরাপত্বায় গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়গুলোর প্রতি নিরাপত্বা সদস্যদের সতর্ক থাকার কথা, সেগুলো চিহ্নিত করতে তারা অযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন বলে মনে করছে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ১২ বছরের ব্রিটিশ-বাঙালি শিশু নাহিয়ানসহ অনেকে। টিউলিপ ও তাঁর স্বামী ক্রিস পার্সি একটি মিডিয়াম আকারের ছুরি দিয়ে তাদের ওয়েডিং কেইক কাটছিলেন।
alt
তাদের পেছনেই দায়িছেলন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, টিউলিপের মা শেখ রেহানা, পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপু মনিসহ অন্যান্যরা। কেইক কাটা শেষ হওয়ার পর ছুরিটি খোলা অবস্থায় বেশ কিছুক্ষন ধরে টেবিলের উপর পড়ে থাকে। এসএসএফ সদস্যদের সেদিকে কোন খেয়ালেই নেই। তারা আছেন কিভাবে প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রিতদের কাছ থেকে দুরে সরিয়ে রাখা যায় সেই চেষ্টায়। হঠাৎ করে ছুরিটির দিকে নজন পড়ে শিশু নাহিয়ানের। সে দৌড়ে যায় একজন এসএসএফ সদস্যের কাছে। ছুরিটি দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্বার স্বার্থে ছুরিটি সেখান থেকে তাড়াতাড়ি সরিয় ফেলতে অনুরোধ করে সে এসএসএফ সদস্যকে। এসএসএফ সদস্য ছুরিটি হাতে উঠিয়ে নিয়ে এই বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষনের জন্যে নাহিয়ানকে ধন্যবাদ জানালেও, কাছাকাছি কোথাও ছুরিটি রাখার স্থান না পেয়ে আবারও তা রেখে দেন ঐ টেবিলেই। অবশ্য কিছুক্ষন পর ছুরিটি সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয় । ঘটনাটি দৃষ্টিতে পড়লে ইয়ার সেভেনের ছাত্র নাহিয়ানের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। টিউলিপের বিয়েতে গীতিনাট্যে অভিনয় করতে প্রখ্যাত কন্ঠ শিল্পী গৌরি চৌধুরীর নেতৃত্বে সে এসেছে বিয়ের অনুষ্ঠানে। তাদের গ্রুপের পরিবেশনা প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও ব্রিটিশ এমপিসহ সব অতিথিদের ব্যাপক প্রশংসা কড়ায়। কেইক কাটার ছুরির বিষযয়ে তাঁর কেন এত ভয়, নাহিয়ানকে এমন প্রশ্ন করলে সে বলে, ‘ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কোন অনুষ্ঠানে যদি কেইক কাটার পর এভাবে খোলা অবস্থায় ছুরিটি কিছু সময় হলেও টেবিলে পড়ে থাকতো, তাহলে এটি ব্রিটিশ মিডিয়ার অন্যতম শীর্ষ খবরে পরিণত হতো। সিকিউরিটির দায়িত্বে নিয়োজিত সদস্যদের যোগ্যতা নিয়ে উঠতো প্রশ্ন, শুরু হতো তোলপাড়। শুনেছি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নাকি উচ্চ নিরাপত্বা ঝুকির মধ্যে রয়েছেন। লন্ডনে তাঁর শত্রুদেরও নাকি অভাব নেই। এমতাবস্থায় কঠোর সিকিউরিটির পরও সন্দেহজনক যে কেউ ঢুকে যেতে পারে অনুষ্ঠানে। এবিষয়গুলোর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখার দায়িত্ব নিরাপত্বা সদস্যদের। কিন্তু বাংলাদেশের নিরাপত্বা সদস্যরা নিরাপত্বা মানেই বুঝেন ভিভিআইপিদের কিভাবে সাধারণ থেকে দুরে রাখা যায়, সাধারণ মানুষের সাথে মিশেও যে ভিভিআইপিরা নিরাপত্বা পেতে পারেন, সেটি বুঝেন না তারা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেমেরণ ট্রাফিক এড়াতে আন্ডারগ্রাউন্ডেও চলাফেরা করেন, তাঁর নিরাপত্বা কিন্তু ঠিক মতই হয়’। নাহিয়ান আরো বলে, ‘এর আগেও আমার বয়স যখন ৮, তখন আব্বুর সাথে শেখ হাসিনার একটি অনুষ্ঠানে আমি গিয়েছি।
দেশটির প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লূর রহমানের সাথেও আমরা পুরো পরিবারের মিট করার সুযোগ হয়েছে। সব অনুষ্ঠানেই দেখেছি সাধারণ মানুষকে ভিভিআইপি থেকে দুরে রাখাই যেন বাংলাদেশের সিকিউরিটি সদস্যদের মূল দায়িত্ব এমনটাই তারা মনে করেন।
alt কোন কোন ব্রিটিশ ভিআইপি’র সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগও আমার হয়েছে। কিন্তু শত কঠোর সিকিউরিটির পরও তারা ভক্তদের সাথে মিশেছেন বিনা বাধায়’। নাহিয়ান জানায় আজকের অনুষ্ঠানেও সে ও তাঁর কয়েকজন সহকর্মী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু তাদের সাথে সিকিউরিটি সদস্যদের আচরণ ছিল ‘প্রধানমন্ত্রীর জীবন যেন তাদের হাতে বিপন্ন’ এমন ভাবের। এত ‘যোগ্য’ নিরাপত্বা কর্মীর সামনে এমন একটি ক্রাউডেড অনুষ্ঠানে দীর্ঘক্ষন খোলা অবস্থায় একটি ছুরি প্রধানমন্ত্রীর সামনেই পড়ে থাকে এটি কেমন করে করে হয়, প্রশ্ন নাহিয়ানের।
এদিকে, সোমবার বেলারুশের উদ্দেশ্যে লন্ডন ত্যাগের আগে স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় হোটেল স্যুটে প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেন ব্রিটিশ এমপিদের সাথে। বৈঠক রুমের সামনে বসানো হয় আর্চওয়ে। ব্রিটিশ সিকিউরিটির একজন সদস্য সংশ্লিষ্টদের এই আর্চওয়ে দিয়ে ঢুকিয়ে নিরাপত্বা চেক করছেন। এমন সময় একজন এসএসএফ সদস্য নিচুস্বরে ওই ব্রিটিশ সদস্যের কাছে জানতে চান আর্চওয়ের কোন লাইট কেন জ্বলে, সন্দেহ জনক, বেশি সন্দেজনক হলে কোন লাইট জ্বলবে ইত্যাদি। ব্রিটিশ সিকিউরিটির ঐ সদস্য হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকেন প্রশ্নকারী এসএসএফ সদস্যের দিকে। ঘটনাটি সেখানে উপস্থিত একজন নজরে পড়লে পরবর্তীতে কথা হয় ব্রিটিশ সিকিউরিটির ঐ সদস্যের সাথে তাঁর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্রিটিশ সিকিওরিটির ঐ সদস্য জানান বাংলাদেশের একজন ট্রেইন সিকিওরিটি সদস্যের এমন প্রশ্ন শুনে তিনি বিষ্মিত হয়েছেন। হাই সেইফটি রিস্কের একজন ভিভিআইপি’র নিরাপত্বার দায়িত্বে নিয়োজিত একজন সদস্য এই সাধারণ বিষয়গুলো জানেন না, এটি ভেবেই তাঁর বিষ্ময়, এমনটাই জানান তিনি । একজন মিডিয়া কর্মী হিসেবে সাংবাদিক নিজের পরিচয় দিলে সিকিওরিটি সদস্য এ বিষয়ে কোন রিপোর্ট করলে তাঁর নাম উল্লেখ না করতে অনুরোধ জানান।