ব্রিটেনে ও সৌদীতে বাঙালির আবাস এবং আমাদের দূতাবাস
ফারুক যোশী-মানচেস্টার থেকে , বুধবার, জুন ১২, ২০১৩


বাংলাদেশের জন্যে সৌদি আরবের শ্রমবাজার ধরে রাখা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে প্রায় ২৮ লাখ বাঙালির বসবাস রয়েছে ‍বলে ধারণা করা হয়। তাদের মধ্যে চিকিৎসক-প্রকৌশলীসহ পদস্থ চাকরিজীবীও আছেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে অনেক বাঙালির অবস্থানও চোখে পড়ার মতো। তবে সৌদি প্রবাসীদের তুলনায় তাদের সংখ্যা নেহায়েত অল্প।

সৌদি প্রবাসী সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি হলেন অদক্ষ শ্রমিক। তাদের সবাই যে সৌদি সরকারের খাতায় নিবন্ধিত, তা নয়। লাখ লাখ বাঙালি আছেন, যাদের কোনো বৈধতা নেই সেই দেশে থাকার। কিন্তু তারা আছেন। কাজ করছেন। রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন দেশে। বৈধ লাখ লাখ মানুষের পাশাপাশি এই অবৈধ শ্রমিকদেরই হাড়ভাঙা শ্রম হয়ত শত শত শিশুর মুখে হাসি ফোটাচ্ছে দেশে। তাদের পাঠানো অর্থে শিক্ষার আলো দেখছে হাজারো কিশোর-তরুণ কিংবা তরুণী।

ওই লাখ লাখ শ্রমিকদের কারণেই অন্তত দেড়-দুই কোটি মানুষ দু’বেলা ভাত মুখে দিতে পারছেন কিংবা স্বচ্ছন্দে জীবন কাটাচ্ছেন। সৌদি আরবের শ্রমিকদের পাই পাই পয়সা দেশের কাজে লাগে। দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করে ওই মানুষগুলোর পাঠানো রিয়াল।

যারা পরিজন নিয়ে ইউরোপের চাকচিক্যময় শহরগুলোতে অবস্থান করে, তারা ক’জন তার উপার্জনের এমনকি এক চতুর্থাংশ দেশে পাঠাচ্ছেন নিয়মিত? সে প্রশ্ন ইউরোপ-আমেরিকার রেমিট্যান্স পাঠানো দেখলেই বোঝা যায়। সঙ্গত কারণেই পশ্চিমের দেশে বাস করা বাঙালিরা তা পারেনও না। কারণ তারা এখানেই আবাস গেড়েছেন। বেড়ে উঠছে তাদের আগামী প্রজন্ম এখানেই। কিন্তু সৌদি আরব কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের মানুষগুলো সবই দিয়ে দেয় তার পরিজনের কাছে, প্রয়োজনেই। যে প্রয়োজন নেই ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসরত বাঙালিদের।

২) ব্রিটেনে বাস করে সর্বোচ্চ তিন লাখ বাঙালি। যদিও বলা হয় পাঁচ লাখের কাছাকাছি। তার মাঝে অর্ধেকের চেয়েও বেশি নারী-শিশু কিংবা তরুণ-তরুণী। এদের একটা বড় অংশ ব্রিটেনের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠছে। এরা ব্রিটিশ। এদের আমরা বাংলাদেশি অরিজিন বলি। এই অরিজিনদের জন্যে বাংলাদেশ সরকার রেখেছেন তিনটা অফিস। লন্ডনের প্রধান হাইকমিশনসহ বার্মিংহাম এবং ম্যানচেস্টারে আছে সহকারী হাইকমিশনও। কিন্তু দেখেছি আমরা এদেরও কাজের পরিধি অনেক বিস্তৃত। ম্যানচেস্টারের হাইকমিশনকে এমনকি দৌড়োতে হয় স্কটল্যান্ডে, সেবা প্রদান করতেই হয় সেখানে গিয়েও। কিন্তু ২৮ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্যে সে হিসেবে দুটো কনস্যুলেট অফিস (অ্যাম্ব্যাসি) কি কোনো যুক্তির মাঝে পড়ে? ব্রিটেনে অবস্থানরত ৮০ শতাংশ বাঙালিই বলতে গেলে ব্রিটিশ এবং প্রায় তিন ভাগ বাঙালি হয়ত অবৈধ, যারা এখানকার পরিভাষায় ওভারস্টেয়ার । এ হিসেবে হাইকমিশনের কাজের পরিধি এত ব্যাপক নয়। তবুও ম্যানচেস্টারের সহকারী হাইকমিশনার জকি আহাদ প্রায়ই বলে থাকেন লোকবলের ঘাটতির কথা। তারা হিমশিম খান মানুষের ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ স্ট্যাম্প কিংবা বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরির চাপে। তাদের দখল সামলাতে হয়। হয়ত অনেকেই বলবেন, হাইকমিশন শুধু দেশের মানুষ নিয়ে চিন্তা করে না, দুদেশের এমনকি কূটনৈতিক সম্পর্ককে উন্নত করাই তাদের মূল দায়িত্বের একটি।

সে হিসেবে সৌদি আরবের প্রবাসী মানুষগুলোর প্রতি দায়িত্ববোধ অনেক বেশি হওয়াই উচিৎ। সেদেশে বসবাসরত বাঙালিদের একটা বৃহৎ অংশ অদক্ষ শ্রমিক। শিক্ষা-দীক্ষায় এদের একটা বিরাট অংশ পিছিয়ে। তাছাড়া সৌদি আরবের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ইউরোপের সাথে তুলনাই করা যায় না। ‘কফিল’ কিংবা স্পনসরশিপ পদ্ধতির কারণে এই শ্রমিকদের ভুগতে হয় বর্ণনাতীত। বাধ্য হয়ে এই ২৮ লাখ শ্রমিকদের সংখ্য্যাগরিষ্ট অংশের শরণাপন্ন হতে হয় অ্যাম্বাসি কিংবা কনস্যুলেটের। কিন্তু অফিসই যদি কম থাকে। এবং নাগালের বাইরে থাকে, তবে মানুষ সেবা পাবে কিভাবে? রিয়াদ জেদ্দা দুটো শহর। এই শহরগুলোর পাশাপাশি অন্তত আর কিছু শহরে কনস্যুলার অফিস স্থাপন করার চিন্তা করতে পারে না সরকার? তিন লাখ লোকের জন্যে ব্রিটেনে থাকে তিনটি কনস্যুলার অফিস আর ২৮ লাখ মানুষের জন্যে দুটো অফিস, তা-ও দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এটা মোটেই বাস্তবতার সঙ্গে যায় না। সেজন্যে সৌদি আরবে আরো অন্তত স্থায়ী একটা কনস্যুলার কার্যালয় স্থাপন করা কোনভাবেই সরকারের জন্যে অলাভজনক হবে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাইকমিশনে কর্মরত এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এ কথাটি স্বীকারও করেছেন।

৩) সৌদি আরব সরকারের নতুন ঘোষণা অনুযায়ী গত মার্চ মাসে বেঁধে দেয়া নিয়মে অবৈধ যে কাউকে তিন মাসের মধ্যে অর্থাৎ তিন জুলাইয়ের মধ্যে পাসপোর্ট করতে হবে। সে হিসেবে বাংলাদেশ কনস্যুলেটর মনে করছে অন্তত চার লাখ বাংলাদেশিকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু কনস্যুলেটের হিসেবের বাইরেও অন্তত একলাখ বাঙালি যে আছেন, যারা বাংলাদেশি হিসেবে তাদের পাসপোর্ট করার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে সেদেশে বসবসরত প্রায় সকলেরই ধারণা। যেহেতু সৌদি আরব বাংলাদেশের একটি প্রধান শ্রমবাজার, খুব স্বাভাবিকভাবেই সরকারেরও একটা প্রধান্য আছেই। তাইতো পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি গত ৫ মে ছুটে গিয়েছিলেন এই সংকটে। আলোচনা সেরেছেন সৌদি সরকারের সঙ্গে। আর সেকারণেই পাঁচ লাখ লোকের নতুন পাসপোর্ট তৈরির প্রয়োজনে দেশ থেকে গেছেন ৫৪ জনের লোকবল। কিন্তু কিছুই করা যাচ্ছে না। একটি পত্রিকা রিপোর্ট করেছে, ৯ মে পর্যন্ত এক লাখ ৬৩ হাজার লোককে পাসপোর্ট দেয়া সম্ভব হয়েছে। ৩ জুলাই পর্যন্ত আগামী দিনগুলোর প্রতিদিন সাত হাজার লোককে পাসপোর্ট দেওয়া হলে একলাখ ৬৮ হাজার লোককে পাসপোর্ট দেওয়া সম্ভব হবে। এতে পাসপোর্ট পাওয়া লোকের সংখ্যা দাঁড়াবে তিন লাখ ৩০ হাজারের মতো। বাকি এক থেকে দেড় লাখ লোককে পাসপোর্ট দেওয়া অসম্ভব বলে মনে করছেন পাসপোর্ট প্রদানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা।

আমরা বিশ্বাস করি সরকার আন্তরিক, সেজন্যেই লোকবল পাঠিয়েছে। কিন্তু সময় স্বল্পতায় তা হয়ত হয়ে উঠছে না। কিন্তু তবুও আরও লোকবলের প্রয়োজন, আরো কিছ‚ কর্মকর্তা পাঠালে চলমান প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকেই সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরের অর্ধশতাধিক বুথ থেকে বাকি মানুষগুলোরও পাসপোর্ট প্রদান করা সম্ভব। দেড়লাখ মানুষ কম করে হলেও দেশে পাচলক্ষ মানুষের অন্ন সংস্থান করে। দেড় লাখ মানুষ ফিরে আসা মানে দেশের উপর অর্থনৈতিক চাপ এবং ওই পাঁচ লাখ মানুষের অসহায় ফ্যাল ফ্যাল চেয়ে থাকা।

৪) একটা বিশ্বাস কাজ করতো বাংলাদেশের মানুষের, আর তা হলো ইসলামিক রাজনৈতিক দল বিশেষত জামায়াতে ইসলামী মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষত সৌদি আরবের বাংলাদেশি শ্রমিকদের ব্যাপারে গুটি চালাতো। আসলে তা একধরনের প্রচারণাই। সরকার সার্থকতার সাথেই এখন মোকাবেলা করছে।

পৃথিবীব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা সৌদি আরবকেও ধাক্কা দিয়েছে। বেকারত্ব তাদেরও আছে। এখন তাদের নিবন্ধনের মধ্যেই রাখতে হবে দেশ কিংবা দেশের সকল মানুষদের। যেটা উন্নত দেশগুলোতেও আছে। এখানে কারো নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটি কাজ করে না। সৌদি আরব এখন শ্রমিকদের কাজের জন্যে একটা উপযুক্ত দেশ। এপ্রিল মাসে সৌদি আরব গিয়েছিলাম। শ্রমজীবী মানুষগুলোর মুখে হাসি দেখেছি। প্রত্যেকটি মানুষ কাজ করছেন। ওদের আছে কাজ। অনেকেই বলেছেন, যেন সেই আশির দশকের কাজের ক্ষেত্র সৃষ্ঠি হয়েছে সৌদি আরবে। শুধুমাত্র অবৈধ মানুষগুলো কোনো না কোনোভাবে বৈধ হতে চান। আসলে ব্যাপারটা এখানেই। নিয়ন্ত্রণের মাঝে আসছে দেশটার এই সেক্টরটা। লুকোচুরি কিংবা মিথ্যে তথ্য দিয়ে সৌদি নাগরিকরা মানুষ আমদানি করার পূর্বেকার সুযোগ এখন হারিয়েছে। তাই শ্রমিক ঘাটতি আছে। সেজন্যেই শ্রমিকরাও আসছেন ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে। জেদ্দা এয়ারপোর্টে কাজ করছেন একজন শ্রমিক, ভারতের কলকাতা থেকে আসা। তার বেতনের কথা তিনি নিজেই বললেন। বললেন এই চাকরিতে আসতে যে অর্থ তিনি খরচ করেছেন, এক বছরের কম সময়ের মধ্যেই ঐ অর্থ তিনি তুলে নিতে পারবেন। আবার ওই শ্রমিক বিশ-বাইশ বছরের তরুণ বললেন, “আপনাদের দেশ থেকে আসতে এই জায়গায় খরচ হয়েছে ন্যূনতম পাঁচ লাখ টাকা আর আমার খরছ হয়েছে ৮০ হাজার রুপি।” এরকম তথ্য ১৭ দিন মক্কায়-মদিনায় -জেদ্দায় অবস্থানের সময় বাঙালিদের কাছ থেকেই অহরহই উচ্চারিত হতে শুনেছি। আর এসব কারণ সৌদি প্রশাসনের অজানা নয়। এ-ও একটা কারণ থাকতেই পারে বাংলাদেশের উপর সৌদি আরবের নাখোশ হবার। বাংলাদেশের শ্রম মন্ত্রণালয়কে এসব ব্যাপার ভাবতে হবে। মনিটরিং-এর মাধ্যমে শ্রমিকদের বাঁচাতে হবে দালাল কিংবা ফড়িয়াদের কাছ থেকে। নতুবা এই শ্রমিকরা অসহায় হয়েই ফিরে আসবে বার বার।

৫) আরেকটা ব্যাপার এখানে উল্লেখ করতে চাই। সৌদি আরবের বিশেষত, মক্কা-জেদ্দা-মদিনায় দেখেছি আসলেও বাঙালিরা প্রাধান্য বিস্তার করেছে। বাঙালিদের অস্তিত্বের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি যেন আছে সেসব শহরগুলোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে। মক্কার আশপাশে বিভিন্ন মসজিদ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বেশ কিছু নোটিশ আরবি ভাষা কিংবা ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি বাংলাতেও লেখা আছে। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, পবিত্র হ্যারাম শরিফের পাশে মহনবী (সঃ) জন্মস্থান বলে কথিত একটা সংরক্ষিত ঘর আছে। এখানে নামাজ কিংবা প্রার্থনা না করার জন্যে ইংরেজি আরবির পাশাপাশি বাংলায় নির্দেশনা দেয়া আছে, কারণ রাসুলাল্লাহ (সঃ) জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক আছে তাই। কিন্তু সরকার মানুষের আবেগকে গুরুত্ব দিয়ে ঘরটা সংরক্ষিত করে শধুমাত্র দর্শনীয় স্থান হিসেবে রেখে দিয়েছে। এভাবে আরো বিভিন্ন জায়গায় এমনকি মদিনাতেও দেখেছি বাংলা ভাষার নির্দেশনা।

একটা দেশে মানুষের ভিত কতটা মজবুত হলে রাষ্ট্র এগুলো করে, তা আমরা দেখি লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কিংবা বার্মিংহাম-ওল্ডহ্যামসহ বাঙালি অধ্যূষিত বিভিন্ন কাউন্সিলেও। ইস্ট লন্ডনেতো স্ট্রিটগুলোর নামেও বাংলা লিখা থাকে। স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যেমন হাসপাতালগুলোতে আছে বাংলা অনুবাদের বিভিন্ন নির্দেশনা।

সেজন্যে আমরা মনে করতেই পারি, সৌদি আরব থেকে বাঙালিদের একেবারে সরিয়ে দেয়ার ব্যাপারটা হয়ত আর হবেই না। সেই দেশটাতে বাঙালিরা থাকবে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমৃদ্ধি আনবেই প্রতিনিয়ত। এ ব্যাপারগুলো ধারনায় রেখেই বাংলাদেশ সরকার কি একটা সুদূরপ্রসারী চিন্তা করতে পারে না? পচিশ লাখেরও অধিক মানুষের জন্যে কনস্যুলেট সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন অফিস স্থাপনের ব্যাপারটি আসতেই পারে। মধ্যপ্রচ্যের এই মানুষগুলোর জন্যে সেবা বৃদ্ধিটা কিন্তু মানবিক দায়বোধের মাঝেও পড়ে।