কেমন সিটি চাই ? সরেজমিনে সিলেটীদের ভাবনা
সাব্বির আহমেদ, আব্দুল্লাহ আল নোমান , রবিবার, মে ২৬, ২০১৩


সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচনে সিলেট নগরীর আনাচে কানাচে, পাড়া মহল্লায় বইছে নির্বাচনী হাওয়া।

হোটেল রেস্তোরা, রাস্তাঘাট, মার্কেট, বিপনীবিতান এবং চা-স্টলে শুধু একই আলোচনা। কে হচ্ছেন পরবর্তী মেয়র! এ নিয়ে নগরবাসীর ভাবনার কোনো শেষ নেই। এই ভাবনা থেকে পিছিয়ে নেই তরুণরাও। তারাও খুঁজছেন তাদের পছন্দের মেয়র।

তরুণরা সিলেটকে তথ্য-প্রযুক্তি সমৃদ্ধ সিটি হিসেবে দেখতে চান বলে বাংলানিউজকে একাধিক তরুণ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন।

সিলেটের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শাহজালাল বিশ্ববিদ্যায়, ওসমানী মেডিকেল কলেজ, এমসি কলেজসহ দেশের নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা বাংলানিউজের সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেছেন তাদের চাওয়া-পাওয়ার কথা।

নগরীর তাঁতীপাড়ায় বাসিন্দা রাজধানীর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা সাকিব হোসাইন বলেন, ‘‘একজন নাগরিক হিসেবে প্রথমত শান্তিপূর্ণ নগর চাই। তারপর একটি পরিষ্কার ও দুর্নীতি মুক্ত ও সংঘাতমুক্ত সিটি চাই।”

‘একজন শিক্ষিত নতুন মুখ প্রয়োজন, যিনি সুন্দর নগরী গড়ে তুলবেন’- বলে তার মত ব্যক্ত করেন সাকিব।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ইয়ুথ অব জকিগঞ্জে’র সভাপতি সদ্য আইনপেশায় যোগ দেওয়া মশিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘‘সিলেট সিটি করপোরেশনের অধীনে একটি আধুনিক লাইব্রেরি দেখতে চাই। যেখানে সবাই বিনামূল্যে কম্পিউটার ব্যবহার ও বই পড়তে পারবে। এখানে ওয়াইফাই ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।’’

নগরী বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে সুজন বলেন, ‘‘সিলেট নগরীর রাস্তাঘাট খুব সুরু। এসব রাস্তাঘাট বড় করে মোটরসাইকেল ও সাইকেল চালানোর জন্য আলাদা লেন তৈরি করতে হবে।’’

নগরীর আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক ভবন চলে গেছে উল্লেখ করে সুজন বলেন, ‘বানিজ্যিক এলাকা আলাদাভাবে ঘোষণা করতে হবে।

তার দাবি- পর্যাপ্ত পরিমাণ গণপরিহন এবং নিরাপদ বাস স্টপেজ নির্মাকণ করতে হবে। বাচ্চাদের জন্য খেলাধুলার উন্মুক্ত মাঠ থাকা চাই।

সুজন বলেন, ‘‘প্রবাসী সিলেটবাসীদের সহযোগিতার জন্যে আলাদা কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ শুধু সিলেট নয় সারাদেশের জন্য প্রবাসীদের অনেক বড় অবদান রয়েছে। তারা অনেক কষ্ট করে বিদেশি মুদ্রা পাঠান। সেই অর্থে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে। তাই প্রবাসীদের সহযোগিতার জন্যে সিসিক একটি আলাদ সেল করতে পারে। এটি করতে পারলে প্রবাসীরা আরো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন।’’

আগামী মেয়রের কাছে প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে তরুণ আইনজীবী মশিউর বলেন, ‘‘মেয়রকে দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার পরিচয় দিতে হবে। এমন নগরপিতা হবেন যিনি দল ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের হয়ে কাজ করবেন।’’

এমসি কলেজের ছাত্র মুকিত তুহিন মনে করেন ‘‘তরুণ প্রজন্ম এবার ভেবে চিন্তে— মেয়র নির্বাচিত করবে। তারা শিক্ষিত ও দুর্নীতিমুক্ত নগরপিতা চান। এমন নগরপিতা হতে হবে যে নগরবাসীর সুখে দুঃখে পাশে থাকবে। ’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘তরুণ প্রজন্ম নগরীর জলাবদ্ধতা, যানজট নিরসন ও ফুটপাত দখলমুক্ত দেখতে চায়। তাদের স্বপ্ন অত্যাধুনিক সৌদর্য ও সৌন্দর্যে সিলেটকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়া হবে।’’

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহমেদ নুহিত বলেন, ‘ঐতিহ্যময় ক্বীন ব্রিজ এলাকাকে পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে। আর নগরজুড়ে ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করে রাখতে হবে। জাফলং যাওয়ার রাস্তা শিবগঞ্জ মিরাবাজার সড়ক সংস্কার সহজ সড়ক যোগাযোগ করতে হবে।’’

নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘যেগুলো আছে সেগুলো জ্বলে না। রাতে নগর থাকে অন্ধকার ভুতুড়ে নগরী।”

টিলাগড় এলাকার বাসিন্দা ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালের শিক্ষার্থী সৈয়দ মাহমুদ মূসা বলেন, ‘‘এমন মেয়র নির্বাচিত হওয়া উচিত যিনি নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণকে ভুলে না যান। তরুণদের কাছে যার মূল্যায়ন আছে তিনি উন্নয়ন করতে পারবেন। তারুণ্য চিন্তাভাবনা মিশেল ঘটিয়ে আধুনিক সমৃদ্ধ সিলেট মহানগরী গড়া সম্ভব বলে মন্তব্য করেন স্বেচ্ছাসেবী একটি সংগঠন ‘ইয়ং পাইওনিয়ার্সের সভাপতি মাহমুদ মূসা।

শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আমিনুল করিম মাসুম বলেন, ‘‘হুমায়ুন আহমেদ তার স্মৃতিকথায় বলেছিলেন সারা পৃথিবীর নানা শহর ঘুরে সিলেটকেই তার কাছে সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়েছে। এখনো ঘুরে দেখার জন্য দেশের লোকজন প্রায়ই সিলেটকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন, তবে বিশেষজ্ঞ পরিকল্পনার অভাব ও স্থাপনা নির্মাণ, খোলা স্থানের অভাবসহ নানা কারণে সিলেটের অসাধারণত্ব অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এখনই পদক্ষেপ না নিলে আরো হারাবে।”

নর্থ ইস্ট মেডিকেলের ছাত্র ও নগরীর শিবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা গোলাম শরীফ শাওন বলেন, ‘‘সকালে বের হলেই চোখে পড়ে রাস্তায় জমে থাকা ময়লা আবর্জনা। স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রী আর কর্মজীবী মানুষ এর সম্মুখীন হন। নগরবাসী এর থেকে পরিত্রাণ চান। একই সঙ্গে তারা যানজট ও জলাবদ্ধতাহীন নগরী হিসেবে দেখতে চান। ’’

নয়াসড়ক এলাকার বাসিন্দা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষার্থী তাওসিফ চৌধুরী সিলেটকে চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস, ও খুনখারাবি মুক্ত নগর হিসেবে দেখতে চান।

সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সমন্বয়ক কবির আহমদ জানান, সিটি করপোরেশন স্থানীয় সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটিকে রাজনীতিমুক্ত রাখা প্রয়োজন। কিন্তু রাজনৈতিক দলের নেতারাই নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচিত হওয়ার পর যেন তারা এই প্রতিষ্ঠানটিকে রাজনীতিমুক্ত রাখেন।

এমসি কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র নাসির উদ্দিন জানান,নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে হবে। এমসি কলেজের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরলে একটি নির্মল উপভোগ্য স্থান হিসেবে পরিচিতি পারে।

সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটির ছাত্র মিজানুর রহমান বলেন, “সিলেটকে বাংলাদেশের লন্ডন বলা হলেও বাস্তবে লন্ডন আর সিলেটের মধ্যে রাত-দিন ব্যবধান। আমরা সিলেটকে গ্রিণ সিটি ও তথ্য ও প্রযুক্তি সমৃদ্ধ নগর হিসেবে দেখতে চাই। আগামীতে যিনি মেয়র হবেন তিনি যেন এই দিকটি মাথায় রাখেন।’’

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রেজা নূর মুঈন জানান, সিলেট সিটির ৩০ বছরের মহাপরিকল্পনা করা হয়েছে এই সরকারের আমলে। কাজির বাজার ব্রিজ থেকে শুরু করে, উড়াল সেতু-সড়ক তৈরি, পূর্ববর্তী সড়ক সম্প্রসারণ, ওয়াটার ফ্রণ্ট পার্ক, ধোপাদীঘি রিথিংকিং (জেলখানা স্থানান্তর), ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদী বেশ কিছু নগর পরিকল্পণা সিদ্ধান্ত গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর সাথে সাধারণ মানুষের পরিচয়ের মাধ্যমে সংযোগ ঘটাতে হবে।

কৃতজ্ঞতাঃ বাংলানিউজ