নিহত স্কুল ছাত্র হিমুর মায়ের আক্ষেপঃ এইদেশ ছেড়ে চলে যাবো
রমেণ দাশগুপ্ত , বুধবার, মে ২২, ২০১৩


‘এই দেশে থেকে কি করব? এ দেশ তো আমাদের না। না হলে যারা পশু লেলিয়ে দিয়ে মানুষ খুন করতে পারে, তাদের বিচার হবেনা কেন? তারা নিশ্চয় রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী। যে রাষ্ট্রে খুনীরা এত ক্ষমতবান হয়, সেই রাষ্ট্রে আমাদের থাকার ইচ্ছে নেই। আমরা এই দেশ ছেড়ে চলে যাব।’

কুকুর লেলিয়ে দিয়ে নির্মমভাবে খুনের শিকার মেধাবী ছাত্র হিমাদ্রি মজুমদার হিমু’র মা গোপা মজুমদার বুধবার দুপুরে বাংলানিউজকে ক্ষুব্ধ কন্ঠে এসব কথা বলেন। বৃহস্পতিবার নৃশংস ওই হত্যাকান্ডের এক বছর পূর্ণ হবে।

হিমুর বাবা প্রবীর মজুমদার বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমি মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি, বাংলাদেশে আর থাকব না। এদেশকে আর আমাদের নিজের দেশ বলে মনে হয়না। আমার ছেলে ও-লেভেল দিচ্ছে। পরীক্ষা শেষ হলে চলে যাবার জন্য প্রস্তুতি নেব।’

কোন দেশে যাবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কয়েকটাতে ট্রাই করছি। যেটাতে সুযোগ পাই সেটাতেই চলে যাব।’

চাঞ্চল্যকর হিমু হত্যা মামলার এক বছর পার হতে চললেও নৃশংস এ ঘটনার বিচারে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি হয়নি। পাঁচ প্রভাবশালী আসামীর মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন ইতোমধ্যে জামিন নিয়ে বেরিয়ে গেছেন। বাকি দু’জনকে গত এক বছরেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

এ অবস্থায় সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় অস্থির হিমুর মা-বাবার মধ্যে ছেলে হত্যার সঠিক বিচার না পাবার আশংকা তৈরি হয়েছে। হিমুর অবর্তমানে বেঁচে থাকা তার ছোট ভাই নীলাদ্রির ভবিষ্যত নিয়েও তারা সবসময় উৎকন্ঠার মধ্যে থাকেন। সব মিলিয়ে বড় ধরনের মানসিক চাপ থেকেই মূলত দেশ ছেড়ে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন হিমুর বাবা-মা।

হিমু হত্যা মামলার বাদিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফেরদৌস আহমদও মামলার অগ্রগতিতে হতাশা প্রকাশ করে বাংলানিউজকে বলেন, ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আমাদের আদালতেও আছে। মামলার চার্জশীট হয়েছে। পলাতক আসামীদের গ্রেপ্তারের জন্য আদালত ওয়ারেন্ট ইস্যু করেছেন। এরপর পুলিশ প্রতিবেদন আসবে। পলাতক আসামীদের বিরুদ্ধে ক্রোকী পরোয়ানা জারি হবে, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি যাবে। তারপর গেজেট নোটিফিকেশন শেষে চার্জ গঠন অর্থাৎ বিচার শুরু হবে। কিন্তু সব প্রক্রিয়া যেভাবে ধীর গতিতে এগুচ্ছে তাতে খুব শীঘ্রই বিচার শুরুর সম্ভাবনা নেই।’

বুধবার দুপুরে নগরীর হেমসেন লেইনে হিমুর বাসায় যাবার পর সাংবাদিক দেখেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তার মা গোপা মজুমদার। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘হিমু মরে গিয়ে আমাকে মৃত্যুর চেয়েও কঠিন যন্ত্রণায় রেখে গেছে। আমি ভাল কিছু খেতে পারিনা, ভাল করে ঘুমাতে পারিনা। ভাল কোন জায়গায় যেতে পারিনা। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা যে কী অসহ্য যন্ত্রণা, মা হিসেবে আমার মনে হয় আমি প্রতি মুহুর্তে মারা যাচ্ছি। আমাকে একেবারে নি:স্ব করে দিয়ে সে চলে গেছে।’

মুছে ফেলা হচ্ছে হিমুর স্মৃতি
ভাল গিটার বাজাত হিমু। খুবই সৌখিন ছিল সে। শার্ট, টিশার্ট, প্যান্ট, হাতের ব্রেসলেট সব সুন্দর জিনিস এনে জমা করত বাসায়। ঘরের দেয়াল জুড়ে ছিল তার ছবি, বিভিন্ন ধরনের চিত্রকর্ম। কিন্তু সেই বাসায় এখন দেয়ালে তেমন কোন পেইন্টিংস নেই। পুরো বাসায় শুধুমাত্র বসার কক্ষে খানিক অন্ধকারের মধ্যে ঝুলছে হিমুর একটি ছবি। পড়ার টেবিলটিও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। গিটারটি রাখা হয়েছে চোখের আড়াল করে।

হিমুর বাবা প্রবীর মজুমদার জানালেন, হিমুর কোন স্মৃতি চোখে পড়লেই কাঁদতে থাকেন তার মা। সেজন্য হিমুর পড়ার টেবিলটি তিনি বিক্রি করে দিয়েছেন। গিটারটি মুছে আলমারিতে তুলে রেখেছেন। সব কাপড়চোপড় গরীব লোকজনকে দান করে দিয়েছেন। বাসায় যেন হিমুর কোন স্মৃতি চোখে না পড়ে সেই চেষ্টা তিনি করে যাচ্ছেন নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে হলেও।

এসব কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন প্রবীর মজুমদারও। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমি সকালে মর্ণিং ওয়াকে যেতে পারিনা। বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যেতে দেখলে আমার বুক ভেঙ্গে যায়।’

গোপা মজুমদার বলেন, ‘হিমু চিংড়ি মাছ, খাসির মাংস খেতে খুব ভালবাসত। আমি এখন বাসায় হিমুর পছন্দের কোন খাবার রান্না করতে পারিনা। আমার ছেলে ফল খেতে ভালবাসত। তার বাবা এখন বাসায় কোন ফল আনেনা।’

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি আমার ছেলেকে (হিমুর ছোট ভাই) বাইরে খেলতে যেতে দিইনা। একা স্কুলে পাঠাইনা। তার বাবাকে ছাড়া গেটের বাইরেও যেতে দিইনা। আমার ছেলেকে আমি মানসিকভাবে অসুস্থ বানিয়ে ফেলছি। কিন্তু আমার সবসময় ভয় হয়, আমার ছেলে একা বের হলে তাকেও যদি নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলে।’

এলাকায় মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় ২০১২ সালের ২৭ এপ্রিল নগরীর পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ‘ফরহাদ ম্যানশন’ নামের ১০১ নম্বর বাড়ির চারতলায় হিমুকে হিংস্র কুকুর লেলিয়ে দিয়ে নিমর্মভাবে নির্যাতন করে সেখান থেকে ফেলে দেয় অভিজাত পরিবারের কয়েকজন বখাটে যুবক।

গুরুতর আহত হিমু ২৬ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ২৩ মে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান। হিমু পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ইংরেজি মাধ্যমের সামারফিল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের ‘এ’ লেভেলের শিক্ষার্থী ছিল।

এ ঘটনায় হিমুর মামা প্রকাশ দাশ অসিত বাদি হয়ে পাঁচলাইশ থানায় পাঁচজনকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। আসামীরা হলেন, ব্যবসায়ী শাহ সেলিম টিপু, তার ছেলে জুনায়েদ আহমেদ রিয়াদ এবং রিয়াদের তিন বন্ধু শাহাদাৎ হোসাইন সাজু, মাহাবুব আলী খান ড্যানি এবং জাহিদুল ইসলাম শাওন।

মামলা দায়েরের এক মাসের মাথায় আসামী শাহাদাৎ হোসাইন সাজুকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ২০১২ সালের ১০ অক্টোবর শাহ সেলিম টিপু ও ছেলে রিয়াদ আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠান। কিন্তু সম্প্রতি তিনজনই জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে যান।

এদিকে ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পাঁচলাইশ থানা পুলিশ ওই মামলায় এজাহারভুক্ত পাঁচজন আসামীকে অন্তর্ভুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন। ১৮ অক্টোবর পলাতক আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। কার্যত এরপর থেকে মামলাটি স্থবির হয়ে আছে। পরোয়ানা জারির আট মাস পার হয়ে গেলেও পাঁচলাইশ থানা থেকে এ সংক্রান্ত কোন প্রতিবেদন আদালতে পাঠানো হয়নি।

পাঁচলাইশ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমরা পলাতক আসামীদের গ্রেপ্তারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি। কিন্তু তাদের পাওয়া যাচ্ছেনা। আশা করছি, এক মাসের মধ্যে আমরা পরোয়ানা প্রতিবেদন আদালতে পাঠিয়ে দিতে পারব।’

অভিযোগ আছে, আসামী ধনাঢ্য ব্যবসায়ী শাহ সেলিম টিপু গুরুত্বপূর্ণ সরকারী পদে থাকা নগর আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠজন। মূলত রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই পুলিশ পলাতক আসামীদের গ্রেপ্তার করতে পারছেন না। বিভিন্ন কুটকৌশলে স্থবির হয়ে আছে চাঞ্চল্যকর মামলাটিও।

হিমু’র মা গোপা মজুমদার বাংলানিউজকে বলেন, ‘শাহ সেলিম টিপু রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হলেও সে একজন খুনী। আর খুনীর কোন রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারেনা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভ‍াবে রাষ্ট্রের আইন প্রভাবশালীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। আর এ কারণে আমরা বিচার পাচ্ছিনা।’