বিপাকে মানি ট্রান্সফার এজেন্সিঃবৈদেশিক রিজার্ভে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা
লন্ডন-এইদেশ সংগ্রহ , বুধবার, মে ১৫, ২০১৩


বিদেশে অর্থ প্রেরণের জন্য ব্যবহূত 'মানি সার্ভিসেস বিজনেস একাউন্ট' (এমএসবি হিসাব) বন্ধ করে দেয়ার নোটিসের প্রেক্ষিতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে ব্রিটেনের মানি ট্রান্সফার ব্যবসা।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশে অর্থ প্রেরণকারী এজেন্সি-গুলো। বিকল্প কোন ব্যাংকে একাউন্ট খুলতে না পারলে এসব এজেন্সি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

এ অবস্থায় ব্রিটেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা বৈধ পথে অর্থ প্রেরণের উপায় না পেলে আবারো অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা চাঙ্গা হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেইসাথে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও মারাত্মক ক্ষতির শিকার হবে। তবে ঝুঁকির সম্মুখীন প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালকরা মনে করছেন সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেড যদি সহযোগিতার হাত বাড়ায় তবে এ পরিস্থিতি কিছুটা হলেও মোকাবিলা করা সম্ভব।

ব্রিটেনে বাংলাদেশি মানি ট্রান্সফার এজেন্সির সংখ্যা দুই শতাধিক। দেশটির ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস অথরিটির (এফএসএ) নিয়ম অনুযায়ী বিদেশে অর্থ আদান-প্রদানের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানকে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংকে এমএসবি হিসাব (একাউন্ট) খুলতে হয়। ব্রিটেনের প্রায় ৮০ শতাংশ মানি ট্রান্সফার এজেন্সির এমএসবি একাউন্ট স্থানীয় বারক্লেস ব্যাংকে। আর বাঙালি মালিকানাধীন এজেন্সিগুলোর প্রায় সবারই একাউন্ট এই বারক্লেস ব্যাংকে। এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে তাদের সংশ্লিষ্ট একাউন্টের মাধ্যমে অর্থ আদান-প্রদানের কাজটি করে থাকে। সম্প্রতি বারক্লেস ব্যাংক এসব এমএসবি একাইন্ট বন্ধ করে দেয়ার কথা জানিয়ে মানি ট্রান্সফার এজেন্সিগুলোকে একটি নোটিস পাঠিয়েছে। বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালকদের অনেকেই টেলিফোন কিংবা চিঠির মাধ্যমে এই নোটিস পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। নোটিসে মানি ট্রান্সফার কোম্পানিগুলোকে একাউন্ট অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য ৬০ দিনের সময় দেয়া হয়েছে, যা শেষ হবে আগামী ১০ জুলাই।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মানি ট্রান্সফার ব্যবসায় মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসে অর্থায়ন কিংবা অবৈধ উপায়ে আয়কৃত অর্থ বিদেশে পাচার হওয়ার প্রেক্ষিতে ক্লিয়ারিং ব্যাংকগুলো যে বিশাল অংকের জরিমানার শিকার হয় সেই সম্ভাব্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় বারক্লেস ব্যাংক এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে। এ অবস্থায় একই ঝুঁকির বিবেচনায় অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকও এ একাউন্ট খোলার সুযোগ দেবে না বলেই তাদের ধারণা।

জানা গেছে, মাসিক লেনদেনের পরিমাণ বিবেচনায় এফএসএ মানি ট্রান্সফার এজেন্সিগুলোকে দুই ধরনের লাইসেন্স প্রদান করে থাকে। যারা মাসিক সর্বোচ্চ ৩০ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত লেনদেন করেন তাদের স্মল পেমেন্ট ইন্সটিটিউট (এসপিআই) এবং যারা এর অধিক লেনদেন করেন তাদের অথোরাইজড পেমেন্ট ইন্সটিটিউট বা এপিআই হিসেবে লাইসেন্স প্রদান করা হয়। বাংলাদেশে অর্থ প্রেরণকারী এজেন্সিগুলোর ৫/৬টি ছাড়া বাকি সবগুলোই এসপিআই হিসেবে নিবন্ধিত। এমএসবি ব্যবসার মাধ্যমে মানি লন্ডারিংসহ বিদেশে অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে নানা অপরাধে ব্রিটেনের প্রায় সবগুলো ব্যাংক বিভিন্ন সময় বিপুল অংকের জরিমানার সম্মুখীন হয়েছে। উল্লেখ্য, এইচএসবিসি ব্যাংক মাত্র কয়েক মাস আগে মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধে যুক্তরাষ্ট্রে ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার জরিমানার সম্মুখীন হয়। এমন পরিস্থিতি এড়াতে ব্রিটেনের প্রায় সবকটি হাই প্রোফাইল ব্যাংক কয়েক বছর আগেই এসপিআই লাইসেন্সধারী মানি ট্রান্সফার ব্যবসার একাউন্ট বন্ধ করে দেয়। একমাত্র বারক্লেস ব্যাংক এজেন্সিগুলোকে কিছু কঠিন জবাবদিহিতার শর্তে একাউন্ট রাখার সুযোগ দিয়ে আসছিল।

বাংলাদেশের মানি ট্রান্সফার এজেন্সিগুলোর ব্যবসা হচ্ছে 'ওয়ান ওয়ে জার্নি' অর্থাত্ এসব এজেন্সি শুধু অর্থ প্রেরণ করে; কিন্তু এসব এজেন্সির মাধ্যমে কোন অর্থ ব্রিটেনে আসে না। অন্যদিকে এসব এজেন্সির বেশিরভাগ সেবা গ্রহীতাই নগদ অর্থ প্রদান করে থাকেন। ফলে এসব অর্থের উত্স নিয়েও সন্দেহ থেকে যায়। আর এ দুইটি কারণই কাল হয়েছে বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য। পূবালী এক্সচেঞ্জ কোম্পানি ইউকে লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মহিউল ইসলাম বলেন, মানি ট্রান্সফার ব্যবসার জন্য সর্বশেষ ভরসা ছিল বারক্লেস। কিন্তু তারাও এবার মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় এ ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। তিনি জানান, বাংলাদেশের প্রায় ২০টি ব্যাংকের মানি ট্রান্সফার সেবা রয়েছে ব্রিটেনে। একাউন্ট বন্ধের নোটিসে সোমবার ব্যাংকের মালিকানাধীন এসব এজেন্সির পরিচালকরা জরুরি বৈঠক করেছেন। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা বারক্লেস ব্যাংকের সাথে সমঝোতার চেষ্টা করবেন। তাতে ব্যর্থ হলে সোনালী ব্যাংক ইউকে লি:সহ অন্যান্য ছোটখাট বিদেশি ব্যাংকে তাদের একাউন্ট ট্রান্সফারের চেষ্টা চালাবেন। তিনি বলেন, ব্রিটেনব্যাপী ব্রাঞ্চ রয়েছে এমন ব্যাংক ছাড়া অন্য যে কোন ব্যাংকে একাউন্ট খুলে হয়তো ব্যবসা চালু রাখা যাবে; কিন্তু এতে ব্যবসা কমে ২০ শতাংশে নেমে আসবে। কেননা বারক্লেস ব্যাংকের উন্নত ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা এবং ব্রিটেনব্যাপী পর্যাপ্ত শাখা থাকার কারণে গ্রাহকরা যে কোন স্থান থেকে ঐ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একাউন্টে অর্থ জমা দিতে পারতেন। কিন্তু সোনালী ব্যাংক ইউকে কিংবা হাবিব ব্যাংকের মতো ছোট পরিসরের ব্যাংকগুলো শাখা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে আগের ন্যায় ব্রিটেনের সর্বত্র গ্রাহকদের সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ বাজার দখল করে নিবে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা, যা দেশের বৈদেশিক রিজার্ভের জন্য অশনি সংকেত। তবে সোনালী ব্যাংক সহযোগিতা করলে এ বিপর্যয় অনেকটা মোকাবিলা করা সম্ভব।

উল্লেখ্য, লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৮ শতাংশ যায় ব্রিটেন থেকে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ব্রিটেন থেকে রেমিটেন্সের প্রবাহ ছিল ৭৮৮ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলার। অব্যাহতভাবে বেড়ে ২০১১-১২ অর্থবছরে এই রেমিটেন্সের পরিমাণ হয়েছে ৯৮৭ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন ডলার। বৈধ পথে অর্থ প্রেরণ সহজ হওয়ার কারণেই ব্রিটেন থেকে রেমিটেন্সের এমন ইতিবাচক ফলাফল।

মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী আনিসুর রহমান বলেন, শুধু ব্রিটেনব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের সেবার আওতায় আনার জন্যই বারক্লেসের মতো বড় মাপের ব্যাংকে একাউন্ট খোলা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা সোনালী ব্যাংক ইউকে লি:কে একমাত্র ভরসা হিসেবে বিবেচনা করছেন। তিনি এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংক ইউকে লি: সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করবে বলে আশা ব্যক্ত করেন।

সোনালী ব্যাংক ইউকে লি:-এর প্রধান নির্বাহী আতিউর রহমান প্রধান এই প্রতিবেদককে জানান, সোনালী ব্যাংক ইউকে লি: ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। এটা বাংলাদেশের মালিকানাধীন বহির্বিশ্বের একমাত্র ব্যাংক। ব্রিটেনের বাঙালি অধ্যুষিত ছয়টি শহরে তাদের শাখা রয়েছে। মানি ট্রান্সফার এজেন্সিগুলোর হাইলি কমপ্লায়েন্সের শর্তে তারা একাউন্ট খোলার বিষয়টি বিবেচনা করবেন। বিশেষ করে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ব্যাংকের যেসব এক্সচেঞ্জ হাউজ রয়েছে সেগুলোকে সাহায্য করার জন্য তারা চেষ্টা করবেন। তবে সেটা কোনভাবেই এমএসবি ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট আইনের বিন্দু পরিমাণ বাদ দিয়ে নয়।
দৈনিক ইত্তেফাক