মায়ের হাতে হুমায়ূনের চিত্র কর্ম তুলে দিলেন বিশ্বজিত সাহা
লন্ডন-এইদেশ সংগ্রহ , শুক্রবার, মে ১০, ২০১৩


খ্যাতিমান লেখক, জননন্দিত কথাসাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলোতে আঁকা ২১টি চিত্রকর্ম হস্তান্তর করা হয়েছে লেখকের মা আয়েশা ফয়েজের হাতে।

রাজধানীর পল্লবীতে আয়েশা ফয়েজের বাসভবনে বুধবার তার হাতে হুমায়ূন আহমেদের আঁকা ছবিগুলো তুলে দেন মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের সভাপতি বিশ্বজিত সাহা।

এসময় প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের দুই ভাই ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ও আহসান হাবিব এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা এ সময় উপস্থিতি ছিলেন।

হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মা আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন।

এসময় বিশ্বজিত সাহা চিত্রকর্ম হস্তান্তর অনুষ্ঠানের ওপর মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের লিখিত বক্তব্য পড়েন। এর পরে ২১টি ছবি হুমায়ূন আহমেদের মায়ের হাতে হস্তান্তর করা হয়।
যে ছবিগুলো লেখকের মায়ের হাতে হস্তান্তর করা হয় : মেঘের খেলা দেখে কতো খেলা পড়ে মনে-১, মেঘের খেলা দেখে কতো খেলা পড়ে মনে-২, তৃষ্ণা, ক্লান্ত দুপুর, সুন্দরবন, মেঘবালিকা, কৃষ্ণচ‚ড়ার কান্না, কার ছায়া গো জলে?, ফেরা, পুরোনো সেই দিনের কথা, বনমর্মর, যাত্রা, ঝর ঝর মুখর বাদল দিনে, ফাগুনের নবীন আনন্দে, বৃক্ষের তন্দ্রা, দিনের শেষে, স্বপ্ন, আমেরিকায় বসন্ত, বনবালা, মধ্যাহ্ন এবং পুষ্পকথা। ছবিগুলো এঁকেই সেগুলোর নাম দিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ।

এর মধ্যে প্রথম ২০টি চিত্রকর্ম নিয়ে নিউইয়র্কে গত বছরের ২৯ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদের জলরঙ চিত্রকর্মের প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

চিত্রকর্ম হস্তান্তরের আগে হুমায়ূন আহমেদের দেওয়া নামগুলো পড়ে শোনান মেজর (অব.) আহসান উল্লাহ। এগুলো হস্তান্তরে সহযোগিতা করেন বাংলাপ্রকাশের তৌহিদুজ্জামান মিয়া। প্রতিটি চিত্রকর্মের বিষয় ব্যাখ্যা করে বর্ণনা দেন বিশ্বজিত সাহা। চিত্রকর্মগুলো হুমায়ূন আহমেদের মায়ের কাছে হস্তান্তরের পর সংরক্ষণ করেন ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। চিত্রকর্মগুলোর বর্ণনার সময় পরিবারের সদস্যরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

বিশ্বজিত সাহা বলেন, “আপনারা নিশ্চয়ই অবগত রয়েছেন নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদ কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা করাতে ২০১১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে যান। এর সপ্তাহ খানেক পর থেকেই তার জ্যামাইকার বাসভবনে শুরু হয় তার ভাষায় ‘রং নিয়ে খেলা’। পরম আনন্দে তিনি এঁকে গেছেন বাংলার নৈসর্গিক দৃশ্যসহ বিভিন্ন চিত্র। ছবিগুলো আঁকার সময় হুমায়ূন আহমেদ ছবির থিম, রং এমনকি দৃশ্যাবলী নিয়ে রুমা সাহার সঙ্গে আলোচনা করতেন। রুমা ছবিগুলির ফ্রেমের রং, ডিজাইন, ম্যাটিং করে হুমায়ূন আহমেদকে দেখাতেন। ছবিগুলো প্রদর্শনীর জন্য উপযোগী করার জন্য রুমা সাহা তার মেধা, শ্রম, সময়, মনন সর্বোতভাবে নিয়োগ করেন।”

তিনি আরো বলেন, “গত বছরের ৮ মে মা ও মাতৃভূমিকে দেখতে দেশে যাবার আগের দিন ৭ মে রাতে ওজোনপার্কের বাড়ির লিভিংরুমে বসে চিত্রকর্মগুলোর নামকরণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। ক্যাটালগে ব্যবহার করার জন্য চিত্রকর্মগুলোর ছবি তোলেন আলোকচিত্র শিল্পী নাসির আলী মামুন। যা পরবর্তীতে (তিনি তার ক্যামেরায় তোলা চিত্রকর্মগুলোর ছবি) ঢাকায় গিয়ে অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলামকে দেন। নামকরণসহ ছবিগুলো ক্যাটালগে প্রকাশ করার জন্য হুমায়ূন আহমেদের নিজ হাতে লেখা কাগজটি আমাকে দেন। যা আমি ২০১২ সালের ৯ মে ই-মেইলের মাধ্যমে মাজহারুল ইসলামকে পাঠিয়ে দেই। ক্যাটালগটি অন্যপ্রকাশের সৌজন্যে প্রকাশিত হয়। ক্যাটালগগুলো ঢাকা থেকে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে নিউইয়র্কে যায় ২ জুন।”

বিশ্বজিত সাহা বলেন, “যদিও তার প্রথমে ইচ্ছে ছিল ৬৩তম জন্মদিনের সময় (১৩ নভেম্বর ২০১১) প্রদর্শনীটি হোক। পরবর্তীতে ভাবেন গত বছরের ২৬ মার্চের কথা। বাস্তবতার কারণে শেষ পর্যন্ত প্রদর্শনী হলো ২০১২ সালের ২৯, ৩০ জুন ও ১ জুলাই নিউইয়র্কের আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলায়। এই প্রদর্শনী সফল ও সুন্দরভাবে করার জন্য আলোকচিত্র শিল্পী ওবায়দুল্লাহ মামুনের নামও উল্লেখযোগ্য। চিত্রপ্রদর্শনীর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল সরবরাহ ও প্রচার (ফ্লায়ার, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন প্রায় ৬ মাস ধরে) করে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন। এ প্রদর্শনীর ফলে উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত সমস্ত বাংলা ভাষাভাষী মানুষ হুমায়ূন আহমেদের এসব অনন্য সৃষ্টি অবলোকন করেন। যা ইতিহাসের ধারায় অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন অন্য এক হুমায়ূন আহমেদ।”

“হুমায়ূন আহমেদের শেষ জীবনের ইচ্ছে অনুযায়ী এই চিত্র প্রদর্শনী যখন নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয়, তখন তিনি বেলভ্যু হাসপাতালের আইসিউতে। প্রদর্শনীর সময় ক্যাটালগটি আমাদের হাতে না পৌঁছানোর ফলে প্রদর্শনীতে উপস্থিত সুধীজনদের মাঝে তা সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। হুমায়ূন আহমেদ যেদিন দেশ থেকে নিউইয়র্কে আসেন, সেদিন ক্যাটালগের একটি কপি আমাকে দেন। সে কপিটি খুঁজে পাওয়ার পরই অনুধাবন করি, তিনি ক্যাটালগ ছাপার আগে কয়েকটি ছবির নামকরণেরও পরিবর্তন করেছিলেন। আমরা সে ক্যাটালগটির ফটোকপি করে এনেছি ইতিহাসের প্রয়োজনে।”

তিনি বলেন, “প্রদর্শনী এবং ক্যাটালগে যে চিত্রটি (পুষ্পকথা) হুমায়ূন আহমেদ স্থান দেননি সেই ২১ নম্বর চিত্রকর্মটি ক্যাটালগের শেষ পৃষ্ঠায় সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। এ সংযুক্তির ফলে মোট চিত্রকর্মের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে (প্রদর্শনীতে ২০টি +পুষ্পকথা) সর্বমোট ২১টি। দূর্ভাগ্যবশত প্রদর্শনীর সময় ‘ফেরা’ নামের চিত্রটি হারিয়ে যায়। যার জন্য নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের কাছে ছবিটির কপিসহ অভিযোগ দাখিল করা হয়, যার নম্বর ২০১৩-১০৩-০১২১৩, ১ জুলাই ২০১২।”

বিশ্বজিত সাহা বলেন, “আমাদের কাছে থাকা হুমায়ূন আহমেদের (২০+১) মোট ২১টি চিত্রকর্ম থেকে জীবোদ্দশায় হুমায়ূন আহমেদ রুমা সাহাকে ৪টি চিত্রকর্ম দিয়েছিলেন। সেই চিত্রকর্মগুলোও আমরা রাখিনি। আমরা আমাদের কাছে রাখা সবগুলো চিত্রকর্ম (২০টি মূলচিত্র + ১টি ছায়া কপি = ২১টি) তার শ্রদ্ধেয়া মায়ের কাছে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হাতে তুলে দিতে পারা এবং নিজেদের আরাধ্য কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি বলে পরম করুণাময়কে ধন্যবাদ জানাই। আর এ তুলে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত আমার লেখা ‘হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’ গ্রন্থের ‘চিত্রকর হুমায়ূন আহমেদ’ পরিচ্ছেদে।”

হস্তান্তর শেষে বিশ্বজিত সাহা উপস্থিত সাংবাদিকদেরকে ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি এ অনুষ্ঠানকে স্বার্থক করার জন্য ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, সাংবাদিক নাসিমুন নাহার নিনি, মেজর (অব.) আহসান উল্লাহ এবং প্রকাশনা সংস্থা বাংলা প্রকাশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ও আখতারুল আলমকে ধন্যবাদ জানান। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিদেশ ভ্রমণ সংক্রান্ত জটিলতা এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সব মিলিয়ে চিত্রকর্মগুলো হস্তান্তরে সময় লেগেছে বলে বিশ্বজিত সাহা আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন।

হস্তান্তর শেষে হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের পক্ষ থেকে ড. জাফর ইকবাল মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের সদস্যদের এবং সভাপতিকে ধন্যবাদ জানান।